মানুষ কেন প্রশ্ন করে? অজানার প্রতি দোলাচল ও সত্যের অনন্ত অনুসন্ধান
By লেখক: জহিরুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী, চকরিয়া-পেকুয়া, কক্সবাজার, বাংলাদেশ
রাতের অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকিয়ে আদিম মানুষ প্রথম কী অনুভব করেছিল—ভয়, বিস্ময়, না কৌতূহল? হয়তো এই তিন অনুভূতির মিলনেই তার মনে জন্ম নিয়েছিল মানবজাতির প্রথম গভীর প্রশ্ন—
“এই অসীম মহাবিশ্বের মধ্যে আমার অবস্থান কোথায়?”
সে জানত না নক্ষত্রের দূরত্ব, জানত না পৃথিবীর বয়স, জানত না জীবনের উৎপত্তির রহস্য। কিন্তু সে প্রশ্ন করতে পেরেছিল।
আর সেই প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে দিয়েছে। মানবজাতির ইতিহাস আসলে প্রশ্নেরই ইতিহাস। আগুনের আবিষ্কার, ভাষার সৃষ্টি, সমাজের নির্মাণ, দর্শনের জন্ম, বিজ্ঞানের বিকাশ, শিল্প ও সাহিত্যের সৃষ্টি—প্রতিটি বড় অর্জনের গভীরে রয়েছে অজানাকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
তবে প্রশ্ন শুধু আলোর পথ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তা, সংশয় এবং নিজের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি।
প্রশ্ন মানুষকে মুক্ত করে, আবার কখনো তাকে নতুন দ্বিধার সামনে দাঁড় করায়। প্রশ্ন সত্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে, আবার ভুল প্রশ্ন মানুষকে বিভ্রান্তও করতে পারে।
তাই প্রশ্নের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে শুধু তার শক্তি নয়, তার সীমাকেও বুঝতে হবে।প্রশ্ন হলো মানবচেতনার এক চিরন্তন দোলাচল—একদিকে অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তার ভয়; একদিকে সত্যের অনুসন্ধান, অন্যদিকে নিজের সীমার উপলব্ধি। এই দ্বন্দ্বই মানুষকে মানুষ করে তোলে।
প্রশ্ন: মানুষের অস্তিত্বের প্রথম প্রকাশ
একটি শিশু পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার পর থেকেই প্রশ্নের মাধ্যমে তার চারপাশকে চিনতে শেখে।
“আকাশ নীল কেন?”
“বৃষ্টি কেন পড়ে?”
“মানুষ কেন হাসে?”
“আমি কোথা থেকে এলাম?”
শিশুর এসব প্রশ্ন মানবচেতনার সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রকাশ। কারণ মানুষ জন্মগতভাবেই অনুসন্ধিৎসু।অন্য প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, কিন্তু মানুষ পরিবেশকে বোঝার চেষ্টা করে। সে শুধু বেঁচে থাকে না; সে জানতে চায়—কেন সে বেঁচে আছে।
প্রশ্নহীন মানুষ কেবল উত্তর গ্রহণ করে, কিন্তু প্রশ্নশীল মানুষ জ্ঞান সৃষ্টি করে।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের প্রশ্ন করার সাহস কমে যায়। সমাজ, অভ্যাস ও প্রচলিত ধারণা অনেক সময় মানুষকে শেখায়—সবকিছুর কারণ জানতে নেই।
অথচ যে সমাজ প্রশ্নকে উৎসাহ দেয়, সেই সমাজেই নতুন চিন্তার জন্ম হয়। প্রশ্ন মানে অবিশ্বাস নয়; প্রশ্ন মানে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস মনে করতেন, সত্যের কাছে পৌঁছানোর পথ হলো যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন। নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করাই জ্ঞানের প্রথম ধাপ।
প্রশ্ন থেকেই দর্শনের জন্ম
মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল, তখনই দর্শনের জন্ম হলো।
আমি কে?
বিশ্বজগতের প্রকৃতি কী?
জীবনের অর্থ কী?
সত্য কী?
ন্যায় ও অন্যায়ের ভিত্তি কোথায়?
এসব প্রশ্ন মানুষকে বাইরের জগতের পাশাপাশি নিজের অন্তর্জগতের দিকেও তাকাতে শেখায়।প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো বাস্তবতা, জ্ঞান ও নৈতিকতার প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করেছিলেন।
অ্যারিস্টটল যুক্তি, প্রকৃতি এবং জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করেছিলেন।তবে মানুষের প্রশ্নের ইতিহাস শুধু গ্রিসে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় ঋগ্বেদের ‘নাসাদীয় সূক্ত’ সৃষ্টি রহস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল—এই বিশ্ব কোথা থেকে এলো? এর উৎস কোথায়?
উপনিষদের ঋষিরা অনুসন্ধান করেছিলেন মানুষের আত্মপরিচয় ও মহাবিশ্বের সম্পর্ক নিয়ে। তাঁদের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন ছিল—
“আমি কে?”
অন্যদিকে চার্বাক দর্শন প্রশ্ন করার এক ভিন্ন পথ দেখিয়েছিল। তাদের মতে, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জ্ঞানের প্রধান ভিত্তি।
যা দেখা, অনুভব বা পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় না, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা উচিত।
গৌতম বুদ্ধ মানুষের দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির পথ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছিলেন।
বিভিন্ন সভ্যতার চিন্তার ইতিহাস প্রমাণ করে—প্রশ্ন কোনো এক জাতি বা সংস্কৃতির সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবতার অভিন্ন বৈশিষ্ট্য।
প্রশ্ন থেকেই বিজ্ঞানের জন্ম: ‘কেন’ থেকে ‘কীভাবে’
বিজ্ঞান হলো প্রশ্নকে পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও প্রমাণের মাধ্যমে অনুসন্ধান করার একটি পদ্ধতি।
দর্শন দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন করেছে—
বিশ্ব কেন এমন? জীবনের অর্থ কী?
আর বিজ্ঞান ক্রমে অনুসন্ধান করেছে—
এটি কীভাবে ঘটে?
এই পার্থক্য মানবজ্ঞানকে আরও গভীর করেছে।
একসময় মানুষ বিশ্বাস করত, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র। কিন্তু নিকোলাস কোপারনিকাস সেই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন।
গ্যালিলিও গ্যালিলেই পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, প্রকৃতিকে বোঝার জন্য যুক্তি ও প্রমাণের প্রয়োজন।
আইজ্যাক নিউটন প্রকৃতির নিয়মকে গাণিতিক ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন।
পরবর্তীতে চার্লস ডারউইন জীবজগতের পরিবর্তন কীভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে ঘটে, তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন।
বিজ্ঞানের প্রতিটি বড় অগ্রগতির পেছনে ছিল একটি সাহসী প্রশ্ন—
“প্রচলিত ধারণাটি কি সত্যিই সত্য?”
প্রশ্ন বনাম কর্তৃত্ব: গ্যালিলিওর শিক্ষা
প্রশ্নের শক্তি কখনো কখনো প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে।গ্যালিলিওর ঘটনা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে—এই ধারণা শুধু একটি বৈজ্ঞানিক বক্তব্য ছিল না; এটি সে সময়ের প্রচলিত বিশ্বদৃষ্টিকেও চ্যালেঞ্জ করেছিল।
গ্যালিলিও শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন চিন্তক।
তাঁর প্রশ্ন ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
ইতিহাস দেখায়, কোনো সমাজে যখন একটি ধারণাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন নতুন প্রশ্ন অনেক সময় অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্নের সীমা: সব প্রশ্ন কি অর্থপূর্ণ?
প্রশ্ন মানুষের জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও সব প্রশ্ন সমান অর্থপূর্ণ নয়।
রেনে দেকার্ত সংশয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তি খুঁজেছিলেন। কিন্তু সংশয়েরও একটি লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন।
লুডভিগ উইটগেনস্টাইন দেখিয়েছেন, ভাষার সীমার সঙ্গে মানুষের চিন্তার সীমারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।নয়।
যেমন—“সৌন্দর্যের ওজন কত?” প্রশ্নটি ব্যাকরণগতভাবে সঠিক মনে হলেও ধারণাগতভাবে সমস্যাযুক্ত।
কারণ ‘ওজন’-এর ধারণা সব ধরনের সত্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ কোনো প্রশ্নের অর্থ শুধু তার শব্দের ওপর নির্ভর করে না; তার পেছনে থাকা ধারণাগত কাঠামোর ওপরও নির্ভর করে।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আসে—কোন প্রশ্নকে গ্রহণযোগ্য বলা হবে, সেটিও সবসময় নিরপেক্ষ
প্রশ্ন, জ্ঞান ও ক্ষমতা
কোনো প্রশ্নের ভাগ্য শুধু যুক্তি দিয়ে নির্ধারিত হয় না; সমাজও অনেক সময় তা নির্ধারণ করে।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শুধু ভাষার সীমার কারণে নয়, সামাজিক কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্কের কারণেও অনেক প্রশ্নকে কখনো ‘অপ্রয়োজনীয়’, ‘বিপজ্জনক’ বা ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করা হয়।
অর্থাৎ কোনো প্রশ্নের অর্থপূর্ণতা শুধু তার যৌক্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; কোন সমাজে, কোন সময়ে এবং কোন পরিস্থিতিতে সেই প্রশ্ন উঠছে, সেটিও তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।ভাষার সীমা যেমন সত্য, তেমনি ক্ষমতার চাপও বাস্তব।
এই দুই স্তরের মধ্য দিয়েই প্রশ্নের ভাগ্য অনেক সময় নির্ধারিত হয়।
মস্তিষ্কের ভেতর প্রশ্নের জন্ম
মানুষ কেন প্রশ্ন করে—এর উত্তর শুধু দর্শনে নয়, বিজ্ঞানেও খোঁজা হচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ভবিষ্যৎ কল্পনা, সম্ভাবনা বিচার এবং বিকল্প চিন্তা করার ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
মস্তিষ্ক যখন কোনো অজানা বিষয়ের মুখোমুখি হয়, তখন এটি সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে থাকে।
নতুন কোনো জ্ঞান অর্জিত হলে মানুষের মধ্যে সন্তুষ্টি বা আনন্দের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। আবার উত্তর অধরা থাকলে জন্ম নেয় অস্বস্তি ও অনুসন্ধানের তাগিদ।
পুরস্কার ও অনিশ্চয়তার এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই প্রশ্নের একটি জৈবিক ভিত্তি রয়েছে।
অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু চিন্তার বিষয় নয়; এটি মানুষের বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মানুষের প্রশ্ন
মানুষের সৃষ্টিশীলতার মূলেও রয়েছে প্রশ্ন।
লালন শাহের প্রশ্ন ছিল অস্তিত্বের—
“মানুষের প্রকৃত পরিচয় কী?”
কাজী নজরুল ইসলামের প্রশ্ন ছিল প্রতিরোধের—
“অন্যায় ও শোষণ কেন থাকবে?”
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় উঠে এসেছে অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা ও সময়ের রহস্য—মানুষ অনন্ত সময়ের প্রবাহে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের প্রশ্নকে যুক্ত করেছিলেন মুক্তি, মানবতা ও আলোর অনুসন্ধানের সঙ্গে।
কারণ যে মন প্রশ্ন করতে জানে, সেই মনই অন্ধকারের মধ্যে আলোর সম্ভাবনা খুঁজে পায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষের প্রশ্ন
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সামনে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
যন্ত্র কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত উত্তর দিতে পারে।
কিন্তু মানুষের মতো বিস্মিত হতে পারে কি?
একটি যন্ত্র নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে। কিন্তু মানুষ প্রশ্ন করে—
“এই বিশাল মহাবিশ্বে আমার অস্তিত্বের অর্থ কী?”
যন্ত্র উত্তর তৈরি করতে পারে, কিন্তু কোন প্রশ্নের পেছনে ছুটলে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়—সেটি মানুষের অস্তিত্বগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ শুধু জানতে চায় না ‘কী’; সে জানতে চায় ‘কেন’। সীমা ও সম্ভাবনার এই দ্বন্দ্বই মানুষের বিশেষত্বের অন্যতম প্রকাশ—যাকে কেবল একটি অ্যালগরিদমের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ করা কঠিন।
উপসংহার: প্রশ্নের মধ্যেই মানুষের সৌন্দর্য
মানুষ হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর কখনোই পাবে না। কিছু প্রশ্ন ভাষার সীমায় থেমে যাবে, কিছু প্রশ্ন নতুন জ্ঞানের আলোয় বদলে যাবে। তবু মানুষ প্রশ্ন করবে। কারণ প্রশ্ন শুধু উত্তর পাওয়ার উপায় নয়; প্রশ্ন হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে বোঝারও একটি পথ। মানুষ যখন নক্ষত্রের রহস্য অনুসন্ধান করে, তখন সে একই সঙ্গে নিজের অস্তিত্বের রহস্যও অনুসন্ধান করে। যখন সে সমাজকে প্রশ্ন করে, তখন সে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা করে। মানুষ তার জানা উত্তরের জন্য মহান নয়; মানুষ মহান সেই সাহসের জন্য, যার মাধ্যমে সে অজানার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে। কারণ প্রশ্নের মধ্যেই আছে মানুষের শেষ আশ্রয়—অসম্পূর্ণতা ও সম্ভাবনার এক অপূর্ব মিলন।