সুস্বাগতম আষাঢ়: মেঘ, বৃষ্টি আর বাংলার চিরন্তন রূপের প্রত্যাবর্তন
By শঙ্খচিল | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | ১৫ জুন ২০২৬
বাংলা পঞ্জিকার তৃতীয় মাস আষাঢ়ের আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বর্ষাকাল। দীর্ঘ গ্রীষ্মের দাবদাহ ও খরার পর প্রকৃতিতে নেমে এসেছে স্বস্তির বার্তা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে মৌসুমি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, আর সেই সঙ্গে বদলে যেতে শুরু করেছে বাংলার চিরচেনা প্রাকৃতিক দৃশ্যপট।
বাঙালির জীবনে আষাঢ়ের এই প্রথম দিনটি চিরকালই একটু অন্যরকম। গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়তে পুড়তে যখন মাটি চৌচির হয়ে যায়, ঠিক তখনই আষাঢ় আসে এক পরম প্রেমিকের মতো, বুকে করে নিয়ে আসে মেঘের গর্জন আর ঝুম বৃষ্টির গান। আষাঢ়-শ্রাবণের এই প্রথম বৃষ্টিতে তপ্ত মাটি যখন ভিজে ওঠে, তখন ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত, চেনা অথচ আজন্ম চেনা সোঁদা গন্ধ। এই গন্ধটাই একজন লেখকের অবশ আঙুলে নতুন করে কলম তুলে দেয়।
জানালার ঠিক বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে বুড়ো কদম গাছটি। আষাঢ়ের স্পর্শ পেয়ে সে যেন আজ নতুন যৌবন ফিরে পেয়েছে। সবুজ পাতার আড়ালে অজস্র কদম ফুল ফুটে আছে—ঠিক যেন প্রকৃতির বুকে ছোট ছোট সোনার গোলক। বৃষ্টির জল পেয়ে সেই কদম ফুলের পাপড়িগুলো থেকে একটা মৃদু, মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। এই সুবাস আর বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ মিলে তৈরি করে এক মায়াবী সুর, যা কান পেতে শুনলে মনে হয় কোনো এক অদৃশ্য ওস্তাদ মেঘমল্লার রাগে তান ধরেছেন।
“আষাঢ়ের এই মেঘলা দিনগুলোতে মানুষের মন বড্ড বেশি অবাধ্য হয়ে ওঠে। মন চলে যায় দূর কোনো অতীতে, যেখানে হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতি বা কোনো প্রিয় মুখের অবয়ব ভেসে ওঠে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায়।”জানালার ওপাশে তাকালে দেখা যায় এক অপরূপ দৃশ্য।
গ্রামের জরাজীর্ণ, শুকিয়ে যাওয়া নদী-নালা আর খাল-বিলগুলো আষাঢ়ের দাক্ষিণ্য পেয়ে নতুন পানিতে টইটুম্বুর হয়ে উঠছে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে কৃষকের দল মেতে উঠেছে নতুন কোলাহলে। এই বৃষ্টি তাদের জন্য শুধু জল নয়, তাদের ঘরে অন্ন জোগানোর নতুন আশার আলো। আমন ধানের চারা বোনার এই ব্যস্ততা বাংলার চিরন্তন রূপকে মনে করিয়ে দেয়।
তবে এই মেঘের ওপারেও একটা বিষাদের ছায়া থাকে। অতিবৃষ্টির ফলে যখন চেনা নদীটি রুদ্র রূপ ধারণ করে, তখন অনেকের জীবনই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নগরের ইট-পাথরের খাঁচায় এই আষাঢ়ই আবার ডেকে আনে অন্তহীন জলাবদ্ধতা আর নাগরিক ক্লান্তি।
তবুও, সবকিছুর শেষে বর্ষাই বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় ঋতু।
কারণ, আষাঢ় আমাদের শুধু ভিজিয়ে দেয় না,
আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত আবেগ, স্বপ্ন আর সৃষ্টিশীলতাকে এক ধাক্কায় জাগিয়ে তোলে। কদম ফুলের এই সুবাস আর মেঘের এই গুরুগুরু ডাক যেন প্রতিবছর আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে যায়—আমরা যতই যান্ত্রিক হই না কেন, আমাদের শিকড় মিশে আছে এই বৃষ্টির জলে, এই বাংলার মাটিতে।