ওমান উপকূলে জাহাজে হামলায় নিহত ৩ ভারতীয় নাবিক, উদ্বেগ নয়াদিল্লির।
By বেঙ্গল টাইমস আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওমান উপকূলের নিকটবর্তী সমুদ্রসীমায় একটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় তিনজন ভারতীয় নাবিক নিহত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ভারত সরকার ঘটনাটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে ওমান উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ এমটি সেট্টেবেলো (MT Settebello)-তে। প্রাথমিকভাবে তিন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ বলে জানানো হলেও পরবর্তীতে উদ্ধার তৎপরতার সময় তাদের মরদেহ শনাক্ত করা হয়। ভারতীয় শিপিং মন্ত্রণালয় নিহতদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জাহাজটিতে মোট ২৪ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন, যাদের মধ্যে ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনাটিকে তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে কর্মরত বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সকল পক্ষের দায়িত্ব এবং এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জাহাজটি তাদের আরোপিত সামুদ্রিক অবরোধ অমান্য করেছিল এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মার্কিন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, জাহাজটি একটি বৈধ বাণিজ্যিক মিশনে ছিল এবং কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না। প্রতিষ্ঠানটি ঘটনার নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ইতোমধ্যেই উচ্চমাত্রায় রয়েছে। হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপসাগরকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক ও কূটনৈতিক সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন এই নৌপথের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নাবিক সরবরাহকারী দেশ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে কর্মরত লক্ষাধিক ভারতীয় নাবিক বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রপথে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ওমান উপকূলে এই হামলার ঘটনাটি শুধু তিনটি প্রাণহানির বিষয় নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভারতের শিপিং মন্ত্রী এই ঘটনাকে “গভীর বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক” বলে অভিহিত করেছেন। নিহত নাবিকদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার তাদের পাশে থাকবে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোও ঘটনাটির প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকরা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা উচিত।
ওমান কর্তৃপক্ষ উদ্ধার কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশটির নৌবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবিত নাবিকদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। ভারতীয় দূতাবাসও উদ্ধার কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্যও একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হলেও ভারত তার নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে ঘটনাটি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত নিরসন না হলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও ওমান উপকূলবর্তী অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বর্তমান আন্তর্জাতিক সংকটের মানবিক মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার একটি করুণ স্মারক।
নিহত নাবিকদের পরিবারের শোকের পাশাপাশি এখন বিশ্বজুড়ে সমুদ্র নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সমাধান এবং সংঘাত প্রশমনের প্রশ্নটিও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
— বেঙ্গল টাইমস আন্তর্জাতিক ডেস্ক