শিক্ষকদের গানে গানে প্রতিবাদের নতুন ভাষা
By বেঙ্গল টাইমস | বিশেষ নিবন্ধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েক দিনে আশির দশকের জনপ্রিয় গান ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ নতুন এক প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এটি আর কেবল একটি নস্টালজিক গান বা বর্ষার আবহের সংগীত নয়; বরং সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং তথাকথিত ‘মোরাল পুলিশিং’-এর বিরুদ্ধে দেশের শিক্ষক সমাজের শান্তিপূর্ণ ও সৃজনশীল প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওকে ঘিরে।
গত ২৩ জুলাই তিনি নীল রঙের শাড়ি পরে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন, যেখানে পটভূমিতে যুক্ত ছিল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটি। সাধারণ একটি ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী তাঁর পোশাক, রুচি ও ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং সাইবার হয়রানি শুরু করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ভিন্নধর্মী একটি প্রতিবাদের পথ বেছে নেন। রাজপথে বিক্ষোভ বা সংঘাতের পরিবর্তে তাঁরা শিল্প, সংগীত এবং সামাজিক সংহতিকেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন।
একই গানের সুরে নিজেদের ভিডিও প্রকাশ করে তাঁরা বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি জানান এবং সাইবার হয়রানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
এই উদ্যোগে শুধু নারী শিক্ষকরাই নন, পুরুষ শিক্ষকও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ঢাকা, বগুড়া, কুমিল্লা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষকরা হাঁটতে হাঁটতে, গান গেয়ে কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে একই বার্তা ছড়িয়ে দেন—শিক্ষকও একজন নাগরিক, তাঁরও ব্যক্তিস্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও আনন্দ প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
অনেক শিক্ষক ভিডিও বার্তায় বলেন, শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, আবৃত্তি ও সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহিত করা যদি শিক্ষারই অংশ হয়, তবে শিক্ষকদের নিজেদের সাংস্কৃতিক প্রকাশকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে, এটি ‘অ্যাস্থেটিকস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা নান্দনিক প্রতিবাদের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কোনো সহিংসতা, বিদ্বেষ বা উসকানি ছাড়াই শিল্প, সংগীত এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সামাজিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদের এই ধরন দেখিয়েছে, সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক প্রকাশও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।ব্যক্তিস্বাধীনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নে শিক্ষকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দিয়েছে—সমালোচনার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিও সমান সম্মান দেখানো প্রয়োজন।