গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট: চরম দুর্ভোগে জনজীবন, উৎপাদনে ধাক্কা
By বিশেষ প্রতিনিধি, বেঙ্গল টাইমস:
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস-সংকটের প্রভাবে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের অভাব, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট এ সংকট কবে কাটবে, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর সরবরাহে বড় ধাক্কা
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর থেকেই দেশের গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুটে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে ২১১ কোটি ঘনফুটেরও কম। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে এর আগেই অক্ষত একটি বয়লার চালুর চেষ্টা চলছে।
সেটি চালু করা গেলে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে কনটেইনারে এলএনজি আমদানির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যদিও এটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
রান্নাঘর থেকে শিল্পাঞ্চল—সবখানেই সংকট
গ্যাসের অভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা কয়েকদিন ধরে রান্নার চুলা জ্বলছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মাটির চুলা কিংবা বিদ্যুৎচালিত ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করছেন।
কিন্তু বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে সেই বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যকর থাকছে না।বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ভালুকার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর নীতিগত অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা।
প্রস্তাবে বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ শতাংশ এবং সিএনজি খাতে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমান সংকটের সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
তিনি বলেন, জনগণের ভোগান্তি কমাতে যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, সংকটের সময় গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা অযৌক্তিক।
সংস্থাটির মতে, প্রয়োজনীয় সেবা দিতে না পারায় গ্রাহকদের বিলের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের মেরামতকাজ সম্পন্ন এবং কারিগরি জটিলতার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের এই সংকট থেকে দ্রুত মুক্তির সম্ভাবনা খুবই কম।