হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published আগস্ট ২৬, ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছর: নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জোরালো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আহ্বান

By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক

IMG_9284

রোহিঙ্গা সংকটের নবম বছর পূর্ণ হলেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো সুস্পষ্ট পথ এখনো তৈরি হয়নি।

দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটকে ঘিরে কূটনীতিক, গবেষক ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি এখন আর শুধু মানবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের যৌথ বিবৃতিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতির প্রতি আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এরপর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের জন্য নেওয়া একাধিক উদ্যোগ কার্যকর ও টেকসই সমাধান আনতে পারেনি।

বদলে গেছে রাখাইনের বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় বাধা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন।

২০১৭ সালের তুলনায় রাখাইন রাজ্যের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কোনো উদ্যোগ শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের যেসব এলাকায় ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা করা হবে, সেসব এলাকায় বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব রয়েছে এমন পক্ষগুলোকেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর আলোচনায় বিবেচনায় নিতে হবে।

তাঁদের মতে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, চলাচলের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক সেবা নিশ্চিত না হলে কোনো প্রত্যাবাসনই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

নাগরিকত্ব প্রশ্নই সংকটের কেন্দ্রে

রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই সংকটের অন্যতম মূল কারণ। মিয়ানমার ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গাদের দেশটির স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

বরং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচয় নিয়ে এই বিরোধের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত।

তাঁরা মনে করেন, প্রত্যাবাসনের আগে নাগরিকত্ব, আইনগত মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে স্পষ্ট সমাধান প্রয়োজন। শুধু সীমান্ত পার করে মানুষকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারও নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ

দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে স্থানীয় ভূমি, বন, পানি, কর্মসংস্থান ও জনসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিবিরগুলোকে ঘিরে মাদক, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগও সামনে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে জমি, বনজ সম্পদ, পানি ও কর্মসংস্থানের ওপর বাড়তে থাকা চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা সহায়তা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে আসায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানবিক সহায়তা জরুরি হলেও শুধু ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে জোর দেওয়ার তাগিদ

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলেও পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাঁদের মতে, জাতিসংঘ, আসিয়ান, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা—ওআইসি এবং অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক পক্ষকে সম্পৃক্ত করে আরও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা না করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য হওয়ায় আঞ্চলিক এই জোটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা, শরণার্থী সুরক্ষা ও কূটনৈতিক উদ্যোগে জাতিসংঘের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

ওআইসিও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিপীড়নের বিষয়টি তুলে ধরে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমন্বিত আন্তর্জাতিক চাপ একক বা সীমিত পরিসরের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ

রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থারও অংশ হয়ে উঠেছে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত গুরুতর অপরাধের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত—আইসিজেতে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত—আইসিসিতেও রোহিঙ্গা ও অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত অপরাধ নিয়ে কার্যক্রম রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মাধ্যমে একা রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ, মানবিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসনের জন্য বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগ

দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এর পাশাপাশি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইনে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব এবং বৃহত্তর অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন শিবিরে বসবাস, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে মানবপাচার, মাদক ব্যবসা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। বরং দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও সুযোগের অভাবকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যাতে vulnerable জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কী প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর প্রত্যাবাসন বলতে শুধু সীমান্ত পার করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানো বোঝায় না। এর সঙ্গে একাধিক মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • * প্রত্যাবাসনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
  • * স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন;
  • * নাগরিকত্ব ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা;
  • * অবাধ চলাচলের সুযোগ;
  • * শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ;
  • * বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা;
  • * প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ; এবং
  • * ফিরে যাওয়া জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তা।

এসব নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যত স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে সাময়িক স্থানান্তরে পরিণত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।

সামনে কঠিন পথ

সর্বশেষ বড় দফার বাস্তুচ্যুতির প্রায় নয় বছর পরও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

রাখাইনে ক্ষমতার পরিবর্তন, নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, মানবিক সহায়তায় অর্থের ঘাটতি এবং বাংলাদেশের ওপর ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে সংকটের সমাধানে দ্রুত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের অপেক্ষায় থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক চাপ, বহুপক্ষীয় কূটনীতি, মানবিক সহায়তা, জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ এবং রাখাইনের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংলাপ—সবগুলোকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রায় এক দশক ধরে চলা এই সংকট যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিস্মৃত কোনো মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত না হয়।

নয় বছর ধরে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি এখন শুধু ‘তারা কবে ফিরবে’ নয়; বরং ‘কী ধরনের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তায় তারা ফিরতে পারবে’—সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।