হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ২৯, ২০২৬

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: জুলাইয়ের ইনডেমনিটি, ভূ-রাজনীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

By শঙ্খচিল​, কলামিস্ট, লেখক

IMG_8509

বাঙালি রাষ্ট্রচিন্তায় ক্ষমতার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নতুন কিছু নয়, তবে ইতিহাস যেভাবে একই চক্রে বারবার ফিরে আসে তা গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ’ নাম দিয়ে যে প্রশাসনিক আইনি বলয় তৈরি করা হলো, তা দেশের সুশীল সমাজ ও আইনজ্ঞদের ভেতরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার বুলি আওড়ে ক্ষমতায় এসে যখন কোনো অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ কোনো পক্ষকে বিচার ব্যবস্থার বাইরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রতিরক্ষামূলক আইন পাস করে, তখন সেই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায়।

বিশ্ব ইতিহাস ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে এই ধরনের ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশের কুখ্যাত ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের পরোক্ষ মদদে ও পুতুল সরকারপ্রধান খন্দকার মোশতাক আহমেদ যে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance, 1975) জারি করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যার পর সেই খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করা।

সেই কালো আইনের মাধ্যমে ১০ বছরের অবোধ শিশু শেখ রাসেল, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে নিহত অন্তঃসত্ত্বা আরজু মনি এবং জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত অ্যাথলেট সুলতানা কামালের মতো নিরপরাধ মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচারে আইনি বাধা তৈরি করা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এই ধরণের ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। ১৯৬১ এবং ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জঘন্য বর্ণবাদী (Apartheid) স্বৈরাচারী সরকার নিজেদের পরিচালিত রাষ্ট্রীয় গণহত্যা ও অন্যায়কে আড়াল করতে অনুরূপ ইনডেমনিটি আইন পাস করেছিল। একইভাবে, ১৯৮০ এর দশকে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা নিজেদের শাসনকে বৈধতা দিতে এবং সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ‘ফুল স্টপ ল’ (Ley de Punto Final, 1986) নামক কুখ্যাত অধ্যাদেশ জারি করে।

বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গেজেটে ৪৪ জন পুলিশ সদস্যসহ ১২০ জনেরও বেশি মানুষের হত্যাকাণ্ডের দায়মুক্তি দেওয়ার আইনি উদ্যোগ মূলত সেই স্বৈরাচারী ও সামরিক মানসিকতারই আধুনিক রূপ।

জুলাই মাসের রক্তক্ষয়ী ঘটনাগুলোর দিনপঞ্জি ও ঘটনাক্রম পর্যালোচনা করলেও এক ধরনের চাতুর্যপূর্ণ ছক প্রকাশ পায়। প্রচারমাধ্যমের সিংহভাগ মনোযোগ যেখানে পরবর্তীতে ঘটা নির্দিষ্ট কিছু মর্মান্তিক ঘটনার ওপর নিবন্ধিত রাখা হয়েছে, সেখানে সংঘাতের প্রারম্ভিক সত্যগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। নথিপত্র প্রমাণ করে, ১৬ জুলাই ২০২৪ এর দুপুরে ঢাকা কলেজের মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাটি ছিল ওই সময়ের প্রথম রক্তাক্ত শিকার। অথচ পরবর্তী সময়ে মিডিয়া কভারেজ এমনভাবে সাজানো হলো যে, সবুজের এই প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড আলোচনার মূল আলো থেকে হারিয়ে গেল।

একই দিনে রংপুরে আন্দোলনকারী ছাত্র আবু সাঈদের বুলেটে প্রাণহানির ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অন্যায় থেকে থাকলে তার সুনির্দিষ্ট বিচার হওয়া যেমন সময়ের দাবি, ঠিক তেমনিভাবে নিহত সবুজ আলীর স্বজনদেরও আদালতের কাছে প্রতিকার পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, এক পক্ষ রাষ্ট্রে সংবর্ধিত হচ্ছে আর অপর পক্ষের রক্ত নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে।আইনের এই দ্বিমুখী প্রয়োগ রাষ্ট্রের আইনি সমতার ধারণাকেই সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখায়।

আবু সাঈদের মৃত্যুর চারপাশের পারিপার্শ্বিকতা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির সঙ্গে এর অদ্ভুত মিল বিশ্ব রাজনৈতিক গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০১০ সালে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত ‘আরব বসন্ত’ (Arab Spring) নামক কালার রেভ্যুলেশনের সময় মিসরে ‘উই আর খালেদ সাঈদ’ (We Are Khaled Said) নামে যে সুনির্দিষ্ট ক্যাম্পেইন গড়ে তোলা হয়েছিল যা পরবর্তী সময়ে সেখানে উগ্রবাদী শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহেও একই ধরনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্যাটার্ন দৃশ্যমান। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় হাসপাতালে না নেওয়া এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যাদি নিয়ে অনুসন্ধানের অবকাশ থেকে যায়।​রাজনৈতিক উথাল পাথালের ঐ দিনগুলোতে যে ব্যাপক সহিংসতা দেখা গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও কোনো একপেশে তদন্ত দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। সরকারি নথিপত্র অনুসারেই, ঐ সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বহুসংখ্যক নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং ক্ষমতার পতনের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে শত শত মানুষ নির্মমতার শিকার হয়েছেন। উপরন্তু, সরকার পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লুণ্ঠিত হাজার হাজার অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং কারাদণ্ডপ্রাপ্ত শত শত অপরাধী ও সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিদের মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।​আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে প্রতিটি নাগরিকের জন্য আইনের সমান বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বিশেষ অধ্যাদেশের দোহাই দিয়ে যদি একতরফাভাবে নির্দিষ্ট কিছু হত্যাকাণ্ডের বিচারে বাধা সৃষ্টি করা হয়, তবে তা সমগ্র বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকেই ধ্বংস করে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭৫ এর ইনডেমনিটি কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা ও আর্জেন্টিনার ‘ফুল স্টপ ল’ শেষ পর্যন্ত বিচারে বাধা দিতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো পক্ষকে আড়াল করার রাজনীতি কখনো টেকসই হয় না, বরং তা জাতীয় ইতিহাসের পাতায় এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই থেকে যায়।