সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগের অধিকার থাকছে বাবা-মায়ের
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার বহাল রাখার বিধান রেখে সংশোধিত আইন পাস করেছে জাতীয় সংসদ।
১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’ সংশোধনের মাধ্যমে এ নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার পথ তৈরি হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (সংশোধন) বিল-২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়।বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
দান করলেও থাকবে ভোগদখলের অধিকার
সংশোধিত বিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি বা নানা-নানি তাদের সম্পত্তি সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে দান করে দিলেও জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন।
অর্থাৎ, সম্পত্তির মালিকানা দানের মাধ্যমে অন্যের কাছে হস্তান্তরিত হলেও দাতার জীবনকালীন ভোগের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।
একই ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও।
দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি দান করা সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার রাখবেন।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে বিলে স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে দাতার ভোগের অধিকার তাতেও শেষ হবে না। পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
কেন আনা হলো সংশোধন?
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও দানের পর দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ও স্বতন্ত্র বিধান ছিল না।
নতুন সংশোধনের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বজায় রেখে সম্পত্তি দানের একটি পৃথক আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, নতুন বিধানটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
প্রচলিত দান বা হেবায় প্রভাব পড়বে না
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন বিধানের ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি বাতিল বা পরিবর্তিত হবে না।
এসব বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর নতুন সংশোধনের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না বলেও সংসদে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বিরোধীদের আপত্তি
তবে বিলটি নিয়ে সংসদে আপত্তি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় সদস্যদের একটি অংশ।
বিল পাসের আগে বিরোধীদলীয় সদস্যরা এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বিলটির বিরোধিতা করে দাবি করেন,
প্রস্তাবিত বিধান ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে।
তার বক্তব্য, দাতাকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের সুযোগ দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তিনি সংসদে বিলটি পাস না করার আহ্বানও জানান।তিনি আরও দাবি করেন, দেশের কয়েকজন আলেম প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে ইসলামী আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন।
নতুন আইনে কী বদলাবে?
নতুন সংশোধনের ফলে সম্পত্তি দান করার ক্ষেত্রে দাতার জীবনকালীন স্বার্থ সুরক্ষার একটি আইনি ভিত্তি তৈরি হলো।
বিশেষ করে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার বসবাস বা ভোগদখল নিয়ে যে ধরনের বিরোধ দেখা দিতে পারে, তা কমানোর লক্ষ্যেই এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে নতুন বিধান বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে এবং উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এটি ব্যাখ্যা করবে—তা সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে।
জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
নতুন আইনি কাঠামো কার্যকর হলে সম্পত্তি দানের পর বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও ভোগদখলের অধিকার আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে উত্তরাধিকারীদের অধিকার এবং দানকৃত সম্পত্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ বিরোধে নতুন বিধানের বাস্তব প্রয়োগই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।