শহীদ মিনারে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষশ্রদ্ধা ও গার্ড অব অনার: বনানীতে দাফন
By বেঙ্গল টাইমস বিশেষ প্রতিনিধি
ঢাকা: বাংলাদেশের আধুনিক পাপেটের পথিকৃৎ, বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও নাট্যনির্দেশক মুস্তাফা মনোয়ারকে চিরবিদায় জানাল জাতি। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এই গুণী শিল্পীর মরদেহে সর্বস্তরের মানুষ শেষশ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তাঁর প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানিয়ে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।
নব্বই বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পরিক্রমা শেষে গতকাল সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে আটটায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি. তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মরহুমের আত্মিক শান্তিকামনা করে শোকবার্তা দিয়েছেন।
শেষ শ্রদ্ধা ও জানাজাআজ সকাল থেকে প্রবীণ এই শিল্পীর শেষযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
প্রথমেই তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনে,
যার প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি. সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল নয়টায় প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয়.বেলা একটার কিছু আগে তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী,
ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা. সর্বস্তরের মানুষের পুষ্পস্তবক অর্পণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়. এরপর তাঁর প্রথম কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে শেষবারের মতো নেওয়ার পর মরদেহ বনানী কবরস্থানে দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
জীবনের শেষ দিনগুলো
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার. গত ঈদুল আজহার পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়. অবস্থার
অবনতি হলে ১৪ জুন তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং গতকাল সকালে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন. মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী মেরী মনোয়ার, ছেলে সাদাত মনোয়ার ও মেয়ে নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
শিল্পভুবনে অনন্য অবদান
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে।
ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রতিবাদী ছবি এঁকে জেলে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
পরে কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে ১৯৫৯ সালে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদকসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি.শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ১৯৬০ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে যুক্ত হয়ে তিনি জনপ্রিয় শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ এবং বিখ্যাত পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ সৃষ্টি করেন. পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত ‘মীনা কার্টুন’ ও ‘সিসিমপুর’ তাঁরই পরামর্শে ও নির্দেশনায় পরিচালিত হয়. পাপেট শিল্পের প্রসারে তিনি গড়ে তোলেন ‘এডুকে পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’।
এমনকি ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্তম্ভগুলোর নেপথ্যে যে চিরচেনা রক্তিম সূর্যটি আজ চোখে পড়ে, সেটির সংযুক্তিও হয়েছিল এই দূরদর্শী শিল্পীর হাত ধরেই. শিল্পকলা
একাডেমি ও জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা এই মহান ব্যক্তিত্বকে ২০০৪ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়।