১৬ জুলাই: জননেত্রীর কারাবরণ ও ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার ইতিহাস
By শঙ্খচিল, কলামিস্ট
২০০৭ সালের ১৬ জুলাই। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কলঙ্কিত ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল এই দিনে।
ভোররাত থেকেই ধানমন্ডির ঐতিহাসিক সুধাসদনের চারপাশ ঘিরে ফেলেছিল তৎকালীন সেনাসমর্থিত অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপুলসংখ্যক যৌথ বাহিনী। চারদিকে এক থমথমে, যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি।
যেন কোনো এক দুর্ধর্ষ অপরাধীকে ধরতে রাষ্ট্র তার সমস্ত মারণাস্ত্র আর শক্তি নিয়োগ করেছে। অথচ যাঁর বাড়ি ঘেরাও করা হয়েছিল, তিনি কোনো অপরাধী ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার মেহনতি মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনা।
তৎকালীন ১/১১ এর কুশীলবরা সুপরিকল্পিতভাবে সেদিন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অবরুদ্ধ ও গ্রেফতার করে। কিন্তু গ্রেফতারের ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে যে অগ্নিঝরা ঐতিহাসিক বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন, তা আজীবন প্রতিটি কর্মীর বুকে লড়াইয়ের মশাল হয়ে জ্বলবে।
কোনো ভীতি বা দ্বিধা ছাড়া তিনি লিখেছিলেন—"প্রিয় দেশবাসী, আমাকে সরকার গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারাজীবন সংগ্রাম করেছি, কোনো অন্যায় করিনি। কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন,
মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব।" তাঁর এই একটিমাত্র চিরকুট সেদিন বন্দি গণতন্ত্রকে মুক্ত করার মহাসংগ্রামের ইশতেহার হয়ে উঠেছিল।
মাইনাস টু ফর্মুলা ও তৃণমূলের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ১/১১-এর ক্ষমতার মসনদ দখলকারী কুশীলবদের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোকে উপড়ে ফেলা এবং শেখ হাসিনাকে চিরতরে রাজনীতি থেকে মাইনাস করা।
এর জন্য সাজানো হয়েছিল বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলার নাটক।কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সুধাসদন থেকে সাব জেলে বন্দি করা গেলেও বাংলার কোটি মানুষের হৃদয় থেকে তাঁর আদর্শকে বন্দি করা অসম্ভব।
দলের কিছু শীর্ষনেতা যখন সংস্কারপন্থী সেজে আপসের চোরাবালিতে পা দিচ্ছিলেন, তখন রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রাণ, তৃণমূলের অকুতোভয় কর্মীরা।
যৌথ বাহিনীর বন্দুকের নলকে তোয়াক্কা না করে, ব্যানার ছাড়াই তীব্র পুলিশি নির্যাতনের মুখেও কর্মীরা রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
শেষ পর্যন্ত তীব্র গণ আন্দোলনের মুখে ২০০৮ সালের ১১ জুন স্বৈরশাসকেরা নেত্রীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট: ষড়যন্ত্রের একই নকশা, আরও হিংস্র রূপইতিহাস সাক্ষী, চক্রান্তকারীরা সাময়িকভাবে পিছু হটলেও তাদের ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে যায় না। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই নেত্রীকে গ্রেফতার করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার যে নীলনকশা তৈরি হয়েছিল, তারই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বর্বর, আধুনিক ও হিংস্র রূপ আমরা দেখলাম ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।
সেদিনও চক্রান্তকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নেতৃত্বহীন করা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের মূল স্তম্ভ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া।
৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের ওপর যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তা একাত্তরের বর্বরতাকেও হার মানায়।
হাজার হাজার কর্মীর ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীকে। একের পর এক কাল্পনিক মামলায় বন্দি করা হয়েছে দলের হাজারো সৈনিককে।
শেষ কথা: ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়১/১১ এর ১৬ জুলাই যেমন আওয়ামীলীগের কর্মীদের কাঁদিয়েছিল, কিন্তু দমাতে পারেনি; ঠিক তেমনি ২০২৪ এর ৫ আগস্টের ক্ষত তাদের রক্তাক্ত করেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পরাস্ত করতে পারেনি। ইতিহাস ঘেঁটে ষড়যন্ত্রকারীরা দেখুক—আওয়ামী লীগ কোনো ড্রয়িংরুমের দল নয়, বন্দুকের নলে জন্ম নেওয়া কোনো পকেট সংগঠনও নয়। এ দলের শেকড় এ দেশের মাটি ও মানুষের হৃদয়ের অতল গভীরে।"যতবার স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, ততবারই আওয়ামীলীগ আরও শক্তিশালী হয়ে রাজপথে ফিরে এসেছে।"আজকের এই দিনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের শপথ—কোনো অন্যায়ের কাছে তারা মাথা নত করবে না। ৫ আগস্টের নির্মমতার কুয়াশা কেটে যাবেই, চক্রান্তকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হবেই এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার দেখানো পথ ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবার ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠবে। জয় নিশ্চিত, কারণ সত্যের জয় অনিবার্য! জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।