হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুন ২০, ২০২৬

ইরান-মার্কিন সংঘাত: পর্দার আড়ালে আসল জয় কি বেইজিংয়ের?

By বেঙ্গল টাইমস বিশেষ প্রতিবেদন

bed67fac-9877-4123-98a4-41d91f33d762

সম্প্রতি মার্কিন-ইরান সংঘাতের পর দুই পক্ষের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। চার মাসের এই যুদ্ধ শেষে তেহরানের শাসনক্ষমতা যেমন অক্ষুণ্ন রয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্বমঞ্চে চীনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বেড়েছে বহুগুণ। বিশ্লেষকদের মতে, এই পুরো সংঘাত থেকে পর্দার আড়ালে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে বেইজিং।

বেঙ্গল টাইমসের পাঠকদের জন্য এই যুদ্ধের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চীনের লাভ-ক্ষতির খতিয়ান তুলে ধরা হলো:​ ‘শান্তির দূত’ হিসেবে কূটনৈতিক পরিপক্বতা​যুদ্ধের শুরুতেই যেখানে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের সরকার পতনের আশঙ্কা করছিল বেইজিং, সেখানে চার মাস পর দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

যুদ্ধ চলাকালীন চীন একের পর এক বিদেশি নেতাদের আতিথেয়তা দিয়েছে এবং নিজেকে একটি দায়িত্বশীল ও শান্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

চার দফার শান্তি প্রস্তাব: গত এপ্রিলে চীনের শীর্ষ নেতা সি চিন পিংয়ের দেওয়া চার দফার শান্তি প্রস্তাব যুদ্ধ অবসানে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্পের মুখে প্রশংসা: খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও চীন যেভাবে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক শক্তি প্রদর্শন না করে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে, তা ওয়াশিংটনের নজর কেড়েছে।

জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের সফল মোকাবিলা​এই সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে যে ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অনেক দেশ সামাল দিতে না পারলেও চীন বেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে। 

এর পেছনে কাজ করেছে বেইজিংয়ের দুটি সুদূরপ্রসারী কৌশল।

বিপুল কৌশলগত তেল মজুত: আপৎকালীন সময়ের জন্য চীনের বিশাল তেলের রিজার্ভ তাদের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়েছে।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার: বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে চীনের দ্রুত রূপান্তর তেলের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা​চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ বিশ্বমঞ্চে মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ফুটিয়ে তুলেছে। 

সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সান দেগাং এই পরিস্থিতিকে ১৯৫০-এর দশকের ‘সুয়েজ সংকট’-এর সাথে তুলনা করেছেন,

যা একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।​"স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একমাত্র পরাশক্তি ভাবলেও, এই যুদ্ধে তাদের সামরিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা শতভাগ সফল হয়নি। সবচেয়ে বড় বিষয়, এই সংকটে মার্কিন মিত্রদের পাশে না থাকাটা পশ্চিমা জোটের ফাটলকেই স্পষ্ট করে।"

তাইওয়ান ইস্যুতে কৌশলগত সুবিধা​রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তাইওয়ান ইস্যুতে মার্কিন মনোযোগ ও প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। 

ইরানের মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশের বিরুদ্ধেও মার্কিন অস্ত্র মজুতের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘস্থায়ী পশ্চিমা জোট গঠনে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা বেইজিংকে এক ধরনের কৌশলগত স্বস্তি দিচ্ছে।

চীনের নিখুঁত ভারসাম্য নীতি​পুরো যুদ্ধজুড়ে বেইজিং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলেছে।

তারা যেমন মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, ঠিক তেমনি ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেছে। বেইজিং নিজেকে কোনো একক পক্ষের অন্ধ সমর্থক হিসেবে না দেখিয়ে একটি 'বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার' প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।

তবে বেইজিংয়ের তসিংহু ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে,

যুক্তরাষ্ট্রের এই সুয়েজ মুহূর্তের মানেই এই নয় যে

চীন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্বব্যবস্থার শীর্ষে চলে যাবে।

মধ্যপ্রাচ্যে এখনো মার্কিন আধিপত্য প্রবল, তবে এখন সেই আধিপত্য ধরে রাখতে ওয়াশিংটনকে

আগের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য চুকাতে হচ্ছে—যার

সুফল পরোক্ষভাবে পাচ্ছে চীন।