ব্রিকসের নেতৃত্বে ভারত: বহুপক্ষীয় স্বার্থের টানাপোড়েন ও কৌশলগত পরীক্ষা
By আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ বিভাগ, বেঙ্গল টাইমস
পরিবর্তনশীল বিশ্বরাজনীতিতে দ্রুত বদলে যাচ্ছে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণের এই সময়ে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন এক বাস্তবতায় ভারতের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বসবে এই সম্মেলন। ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়া ভারতের জন্য এই নেতৃত্ব নিছক আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়; বরং বিশ্বরাজনীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বড় পরীক্ষা।
শক্তি বাড়ছে, কমছে অভ্যন্তরীণ ঐক্য
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস সম্প্রতি সম্প্রসারিত হয়েছে। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় জোটটির অর্থনৈতিক ও জনমিতিক পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৩৭.৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
তবে এই বিস্তৃতির সঙ্গে জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত ও চীন একই জোটের সদস্য হলেও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে তারা পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী। একইভাবে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক বাস্তবতাকেও ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
প্রথম বড় পরীক্ষা: চীন সমীকরণ
ভারতের জন্য ব্রিকসের নেতৃত্বে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা। গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।
নয়াদিল্লির মূল লক্ষ্য হলো ব্রিকসকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তির প্রভাবাধীন জোটে পরিণত হতে না দেওয়া। একই সঙ্গে চীনের প্রভাব যেন ব্রিকসের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা—দুই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে এগোতে হবে ভারতকে।
ইরান-আমিরাত সমীকরণ ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য
ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের আরেকটি বড় উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি। গত ১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সদস্য দেশগুলো একটি অভিন্ন যৌথ ঘোষণা বা বিবৃতিতে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ভারতকে সভাপতির পক্ষ থেকে পৃথক একটি ‘সভাপতির বিবৃতি’ প্রকাশ করতে হয়।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা কতটা কঠিন হতে পারে।
ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট?
আন্তর্জাতিক আলোচনায় ব্রিকসকে প্রায়ই ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে বাস্তবতা আরও জটিল। ভারত নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বজায় রাখছে।
নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে ব্রিকস কোনো নির্দিষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জোট নয়।
বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরা, আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সংস্কারের দাবি জোরালো করা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসকে দেখা হয়।
সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি
নয়াদিল্লি সম্মেলনের জৌলুশের চেয়ে ভারতের নেতৃত্বের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের ওপর।
প্রথমত, ভারত কি চীন, রাশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম কার্যকর সমঝোতা তৈরি করতে পারবে?
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস কি সদস্য দেশগুলোর জন্য বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ব্রিকস কি যৌথ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে?
উপসংহার
সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন ভারতের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। কোনো একক শক্তিশিবিরে না গিয়ে একাধিক পরাশক্তির সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ভারতের নীতির বড় পরীক্ষা হবে এই সম্মেলন।
ভারত কি ব্রিকসকে নিজের আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারবে,
নাকি মতপার্থক্যে ভরা বৈচিত্র্যময় এই জোটকে একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় মঞ্চ হিসেবে ধরে রাখাই হবে মূল সাফল্য—সেপ্টেম্বরের সম্মেলনে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে আন্তর্জাতিক মহল।