রাতের নিস্তব্ধতায় লেকের জল ও রক্তিম রঙ্গন: পিতার চরণে এক নিঃশব্দ নিবেদনআওয়ামী লীগের এক অনুগত কর্মীর হৃদয় থেকে
By সাবিনা ইয়াছমিন , নির্বাহী সম্পাদক, বেঙ্গল টাইমস ।
আজ ১৫ই আগস্ট। শ্রাবণের মেঘভাঙা বৃষ্টি নয়, আজ যেন আকাশ থেকে ঝরছে এক অনন্ত হাহাকার। পঞ্জিকার পাতায় এই একটি তারিখ এলেই বুকের ভেতর পাজরভাঙা এক কান্নার সুর বেজে ওঠে। ১৯৭৫ সালের এই অভিশপ্ত রাতেই তো নিভে গিয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার সূর্য।
বুলেটের আঘাতে রক্তে ভেসেছিলেন আমাদের ইতিহাসের স্থপতি, আমাদের পিতা—জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাজনীতি আমার কাছে কেবল কোনো দল বা পদের নাম নয়, আমার কাছে রাজনীতি মানে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর। রাজনীতির প্রতিটি সংকটে, প্রতিকূলতায় কিংবা প্রাপ্তিতে ঐ প্রতিকৃতির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মনে হতো, বিশাল এক ছায়া মাথার ওপর হাত রেখে বলছে, ভয় পাস নে, এগিয়ে যা।
প্রতি বছর এই দিনে লাল গোলাপের তোড়া হাতে হাজারো রাজনৈতিক সহযোদ্ধার ভিড়ে দাঁড়িয়ে পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্ত।কিন্তু আজকের সকালটা ছিল ভিন্ন।
বুকের ভেতর এক চরম শূন্যতা আর নিঃসঙ্গতার ভার। পরিবর্তিত পরিস্থিতির বৈরী হাওয়ায়, বহু বাধা আর অদৃশ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আজ ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক উঠোনে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। চোখের সামনে রক্তেভেজা সেই সিঁড়ি, অথচ সেখানে পৌঁছানোর প্রতিটি পথ আজ রুদ্ধ।
রাত দশটার নিঝুম অন্ধকারে হাতে একগুচ্ছ লাল রঙ্গন ফুল নিয়ে এসে দাঁড়ালাম বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের ঠিক বিপরীতের ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। রাতের আকাশ তখন বিষণ্ণ, আর লেকের শান্ত জল যেন কোনো এক হাজার বছরের শোককে বুকে চেপে নীরব দর্শকের মতো চেয়ে আছে।
রঙ্গন ফুলগুলোর গাঢ় লাল রঙ আজ কেবল কোনো ফুল মনে হচ্ছিল না; মনে হচ্ছিল ওগুলো যেন আমাদের হৃদয়ের শত সহস্র স্মৃতির রক্তবিন্দু।চারপাশে থমথমে অন্ধকার। হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাকে এক জায়গায় জড়ো করে চোখ দুটো বুজে আনলাম।
মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠল সেই বিশাল তর্জনী উঁচানো প্রকাণ্ড অবয়ব। কাঁপানো দুটি হাতে আলতো করে রঙিন রঙ্গন ফুলগুলো ভাসিয়ে দিলাম লেকের আঁধার ছাওয়া কালচে পানিতে।
রক্তিম ফুলগুলো যখন রাতের মৃদুমন্দ বাতাসে ভেসে ভেসে ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল,মনে হলো আমার চোখের জল, আমার নিঃশব্দ হাহাকার আর পরম শ্রদ্ধা সেই ঢেউয়ের পিঠে চেপে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যাচ্ছে।
জল আর চোখের জলে কোনো তফাত রইল না,লেকের পানি আর এক রাজনৈতিক কর্মীর অশ্রু মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
মনে মনে বললাম, পিতা ওরা হয়তো সূর্যের আলোয় প্রতিকৃতির কাছে আমাদের পৌঁছাতে দেয়নি, কিন্তু রাতের এই নিস্তব্ধতায় তোমার এই সন্তানের হৃদয়ের অশ্রু আর ভালোবাসাকে ঠেকাবে কে?ধানমন্ডি লেকের পানিতে ভাসতে থাকা লাল রঙ্গনগুলো আজ আমাকে এই চিরন্তন সত্য স্মরণ করিয়ে দিল—বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতিতে সীমাবদ্ধ কোনো নাম নন। তিনি জড়িয়ে আছেন এই বাংলার মাটি, জল, হাওয়া আর কোটি মানুষের রক্ত।
আজ কোনো আক্ষেপ নেই, কারও প্রতি ক্ষোভও নেই। কেবল এক পরম সত্য উপলব্ধি করলাম, ইট-পাথরের প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়া হয়তো সাময়িকভাবে আটকে দেওয়া যায়, কিন্তু বাঙালির ধমনীতে প্রবাহিত রক্ত থেকে শেখ মুজিবকে মুছে ফেলার ক্ষমতা এই মহাবিশ্বে কারও নেই। পানি যেমন কোনো বাধা মানে না, নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেয়,তেমনি আদর্শ ও ভালোবাসাও সব শৃঙ্খল ভেঙে প্রিয় নেতার চরণে পৌঁছে যায়।ধানমন্ডি লেকের জলে ভেসে যাওয়া ওই রক্তিম রঙনগুলো আজ আমাকে শিখিয়ে গেল, আওয়ামী লীগের খাঁটি কর্মী হওয়া কোনো ক্ষমতার মহড়া নয়। এটি নিভৃতে কাঁদার ধৈর্য, এটি প্রতিকূলতার মাঝেও বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রাখার এক অগ্নিপরীক্ষা।হে পিতা, আজ তোমার চরণে সরাসরি পুষ্পার্ঘ্য সঁপে দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি সত্যি, কিন্তু লেকের প্রতিটি তরঙ্গে ভেসে গেল এক পরাজিত অথচ বিশ্বাসী সেনানির হৃদয়ের নিঃশব্দ হাহাকার। তুমি শান্তিতে ঘুমাও। তোমার বাংলাদেশ আর তোমার আদর্শ কোনোদিন মুছে যাবে না।