"চেতনার ভিত দুর্বল হলে সমাজও দুর্বল হয়"
By লেখক : জহিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মী, চকরিয়া, কক্সবাজার।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার অর্থনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং আরও বেশি নির্ভর করে সেই জাতির মানুষের চিন্তার গভীরতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং আদর্শিক ভিত্তির ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ তার মননের শক্তি হারায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়ে। বাহ্যিক কোলাহল, স্লোগান কিংবা সাময়িক উচ্ছ্বাস হয়তো কিছু সময়ের জন্য একটি সমাজকে আলোড়িত করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখে তার চিন্তার জগৎ, তার সংস্কৃতি এবং তার যুক্তিবোধ।
বর্তমান সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি গভীর নীরব সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সংকট দৃশ্যমান সংঘাতের নয়; এটি মূলত মননের সংকট। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এখন ব্যস্ততা আছে, সংগঠন আছে, প্রচার আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপরতা আছে—কিন্তু সেই তুলনায় গভীর পড়াশোনা, আদর্শিক চর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনার পরিবেশ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির ভেতরে এই ঘাটতি এখন উদ্বেগজনকভাবে দৃশ্যমান।অথচ এই ভূখণ্ডের ইতিহাস অন্য কথা বলে। বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধ—এসব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রস্তুতি। ভাষা আন্দোলনের সময় সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও ছাত্রসমাজ কেবল রাজপথেই সক্রিয় ছিলেন না; তাঁরা সাংস্কৃতিক জাগরণেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা, নাট্যআন্দোলন, কবিতা পাঠ এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তখন বাঙালির জাতীয় চেতনাকে সুসংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ষাটের দশকে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও রাজনৈতিক ধারার ভেতরে নিয়মিত পাঠচক্র, রাজনৈতিক আলোচনা ও মতাদর্শভিত্তিক শিক্ষার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা বিভিন্ন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা শুধু মিছিল করতেন না; তাঁরা বই পড়তেন, বিতর্ক করতেন এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কে নিজেদের বোধ তৈরি করতেন। রাজনৈতিক কর্মী হওয়া মানেই ছিল একজন সচেতন ও মননশীল মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ, কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যচেতনা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা শহীদুল্লাহ কায়সারের সাহিত্যিক রাজনৈতিক চেতনা—এসবই এ অঞ্চলের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য এ দেশের স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত গড়ে দিয়েছিল, সেই ধারার বর্তমান সারথিদের ওপর আজ এই মননশীলতা রক্ষার দায় সবচেয়ে বেশি।দুঃখজনকভাবে আজ সেই পরিবেশ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের বহু নেতাকর্মীর মধ্যে নিজের রাজনৈতিক দর্শনের ঐতিহাসিক ভিত্তি, অর্থনৈতিক কাঠামো কিংবা সামাজিক লক্ষ্য সম্পর্কে গভীর জানার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
ফলে আদর্শ ধীরে ধীরে চর্চার বিষয় না হয়ে কেবল প্রতীকের বিষয় হয়ে উঠছে। যখন কোনো চেতনার ভেতরে নিয়মিত আত্মসমালোচনা, পাঠ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন থাকে না, তখন তা সহজেই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক পাঠচক্র ও আলোচনা সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া। একসময় ছাত্ররাজনীতি, সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম প্রাণশক্তি ছিল নিয়মিত পাঠসভা। সেখানে ইতিহাস, রাষ্ট্রচিন্তা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আলোচনা হতো। মতভেদ থাকত, তর্ক হতো, কিন্তু সেই তর্কের লক্ষ্য ছিল সত্য অনুসন্ধান এবং মননের বিকাশ।
আজকের বাস্তবতায় সেই জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যস্ততা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ক্ষণস্থায়ী আবেগ। ডিজিটাল যুগ মানুষের সামনে তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার খুলে দিলেও একই সঙ্গে সৃষ্টি করেছে এক ধরনের মনোসংকট।
রিলস, শর্ট ভিডিও ও ক্ষণস্থায়ী কনটেন্টনির্ভর সংস্কৃতি মানুষের মনোযোগকে ক্রমশ ভেঙে দিচ্ছে। মানুষ দীর্ঘসময় ধরে কোনো বিষয় নিয়ে ভাবার কিংবা গভীর পাঠে মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে। ফলে তথ্যের অতিবন্যা থাকলেও জ্ঞানের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রেই সংগঠন টিকে থাকছে, কিন্তু সংগঠনের ভেতরের আদর্শিক প্রাণশক্তি দুর্বল ও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। এটি কোনো একক দলের সংকট নয়; বরং সামগ্রিক সামাজিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—কোনো ধারণা বা বিশ্বাস কেবল ঘোষণা দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে। মানুষ শৈশব থেকে পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেসব ধারণা বারবার শুনে ও দেখে, ধীরে ধীরে সেগুলোই তার চেতনার অংশ হয়ে ওঠে। এই কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে নানা ধরনের ঐতিহ্য, ভাবধারা কিংবা সামাজিক অভ্যাস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। এর পেছনে রয়েছে নিয়মিত চর্চা, পুনরাবৃত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাংগঠনিক কাঠামো।
একই বাস্তবতা অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি এই ধারার মানুষ নিজেই পড়াশোনা, যুক্তিবাদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে দূরে সরে যান, তাহলে সমাজে মননশীলতার জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হবেই। কারণ সমাজে চিন্তার শূন্যতা কখনো দীর্ঘসময় শূন্য থাকে না। সেখানে কোনো না কোনো
প্রবণতা জায়গা করে নেয়। যুক্তিবাদী ও মানবিক চর্চা দুর্বল হলে সংকীর্ণতা, গুজব, আবেগতাড়িত বিভাজন কিংবা অন্ধ অনুসরণের সংস্কৃতি সহজেই বিস্তার লাভ করে।
তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথও আমাদের ইতিহাসের ভেতরেই রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও মানবিক জাগরণ। এই জাগরণের পেছনে কাজ করেছিলেন শিক্ষক, সাহিত্যিক, ছাত্রনেতা, সংস্কৃতিকর্মী এবং অসংখ্য সচেতন তরুণ, যারা সমাজকে বুঝতে চেয়েছিলেন এবং মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতার দিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁদের শক্তি ছিল জ্ঞান, যুক্তি এবং সংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা।
এই কারণেই আজ নতুন করে পাঠচক্র, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং রাজনৈতিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল পড়াশোনার আহ্বান জানানোই যথেষ্ট নয়; বরং কী পড়ব, কেন পড়ব এবং কোথা থেকে শুরু করব—সেই সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরবময় দিনগুলোতে যখন একজন কর্মী রাজনীতির প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করতেন, তখন থেকেই তাঁর মধ্যে কীভাবে নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা যায়, সেই অনুযায়ী বইয়ের তালিকা ও পাঠ-পরিকল্পনা দেওয়া হতো।
এই প্রাথমিক পাঠাভ্যাসের ভিত্তি তৈরি হতো প্রাতিষ্ঠানিক পাঠসভাগুলো থেকে। তাই এখন আবার প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটে সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।
এর আওতায় থাকতে পারে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের দলিলপাঠ, দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা, সংবিধান ও সমসাময়িক রাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা এবং উচ্চাঙ্গ সাহিত্যপাঠ। এই বহুমুখী পাঠাভ্যাসই কর্মীদের কেবল দক্ষ নয়, বরং আদর্শিক ও মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করে তুলবে। তরুণদের বুঝতে শেখাতে হবে সমাজ কীভাবে কাজ করে, অর্থনীতি কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, ইতিহাস কীভাবে রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করে এবং গুজব ও অপপ্রচার কীভাবে সমাজকে বিভক্ত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রগতিশীলতা মানে ভিন্নমতকে ঘৃণা করা নয়। বরং প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনা মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে মতভেদ মোকাবিলা করতে শেখায় এবং মানবিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে শেখায়। কোনো বিশ্বাসকে কেবল আক্রমণ করে নয়, বরং জ্ঞান ও যুক্তির আলোয় বিশ্লেষণ করেই সমাজকে এগিয়ে নিতে হয়।আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ পরিবর্তন কখনো তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি মনন গঠনের প্রক্রিয়া। আদর্শহীন কর্মকাণ্ড সাময়িক সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু তা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। যে সমাজের রাজনৈতিক কর্মীরা বই থেকে দূরে সরে যায়, ইতিহাস ভুলে যায় এবং চিন্তার চর্চা পরিত্যাগ করে, সেই সমাজ একসময় দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে।আজ তাই প্রয়োজন নতুন এক মননশীল জাগরণ। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ, যেখানে সংগঠনের কার্যালয় কেবল প্রশাসনিক ব্যস্ততার জায়গা হবে না; বরং হবে চিন্তার পাঠশালা। সেখানে বইয়ের পাতা খুলবে, ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক হবে, তরুণেরা প্রশ্ন করতে শিখবে এবং সমাজ পরিবর্তনের নতুন রূপরেখা নিয়ে ভাবতে শিখবে।
তবে এই জাগরণের পথে আমাদের একটি বিষয়ে ভীষণ সতর্ক হতে হবে। বর্তমান সময়ে অনেকেই মুখে মুখে আদর্শের নির্দিষ্ট কিছু জনপ্রিয় বুলি আওড়ান, কিন্তু তা মননে ধারণ করেন না। কেবল মুখস্থ বুলি দিয়ে সাময়িক পরিচিতি মিললেও, একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে আদর্শকে ধারণ করেন কি না, তা প্রকাশ পায় তাঁর দৈনন্দিন জীবনাচরণে। তাই নিজেকে আদর্শিক ও প্রজ্ঞাবান করে গড়ে তুলতে হলে শুধু পাতা ওল্টানো নয়, বরং যা পড়া হলো তা গভীরভাবে আত্মস্থ করতে হবে। সস্তা বুলি আওড়ানো কর্মী নয়, আমাদের প্রয়োজন চিন্তাশীল ও মানবিক মানুষ; কারণ চিন্তার সততা যখন আচরণের সততায় রূপ নেয় এবং জ্ঞান যখন জীবনযাপনে প্রতিফলিত হয়, তখনই সংগঠনের প্রকৃত গুণগত রূপান্তর ঘটে।কারণ অন্ধকারকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় অন্ধকারকে অভিশাপ দেওয়া নয়; বরং আলোর বিস্তার ঘটানো। আর সেই আলোর উৎস হলো জ্ঞান, যুক্তি, মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িক মননের নিরন্তর চর্চা।রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানুষের চিন্তাশক্তিতে নিহিত। যে জাতি বই থেকে দূরে সরে যায়, ইতিহাসও একসময় তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। যে জাতি তার মননের শক্তিকে জাগ্রত রাখতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকেই এগিয়ে রাখে।