বহুল আলোচিত বেইজিং সফর: প্রত্যাশার পাহাড়, প্রাপ্তির হিসাব কি মিলেছে?
By স্টাফ রিপোর্টার
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে ঘিরে সরকারি প্রচারণা ছিল ব্যাপক। সফরের আগে সরকারি মহল থেকে এটিকে একটি “ঐতিহাসিক” ও “যুগান্তকারী” সফর হিসেবে তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে এই সফরের আয়োজন করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সফরের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে অগ্রগতি অর্জিত হবে।
কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, দুই দেশের মধ্যে মাত্র দুটি চুক্তি এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ভবিষ্যৎ সহযোগিতা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় কিংবা সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা ও সহযোগিতার কাঠামো মাত্র। কোনো বড় অঙ্কের নিশ্চিত বিনিয়োগ, নতুন মেগা প্রকল্প কিংবা বহু প্রতীক্ষিত অর্থায়নের ঘোষণা সামনে আসেনি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সফরের আগে যে প্রত্যাশার পাহাড় তৈরি করা হয়েছিল, বাস্তবে তার কতটুকু অর্জিত হয়েছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সমঝোতা স্মারক এবং চূড়ান্ত চুক্তির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। একটি MoU মূলত ভবিষ্যতে আলোচনা ও সম্ভাব্য সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু তা কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন বা অর্থ ছাড়ের নিশ্চয়তা দেয় না। অতীতে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শতাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও সেগুলোর অনেকগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ চীন সফর থেকে আরও দৃশ্যমান ফলাফল প্রত্যাশা করেছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, শিল্প খাতে মন্দা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মধ্যে চীনের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির কাছ থেকে বড় ধরনের বিনিয়োগ বা ঋণ সহায়তার আশা করা হয়েছিল।
বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্প, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বড় কোনো ঘোষণা না আসায় অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সফরের আগে যে বিপুল প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা কি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল?
সমালোচকদের অভিযোগ, সরকার প্রায়ই বিদেশ সফরকে বড় অর্জন হিসেবে প্রচার করে, কিন্তু পরে দেখা যায় বাস্তব ফলাফল অনেক সীমিত। তাদের মতে, জনগণ এখন আর কেবল যৌথ বিবৃতি বা সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা দেখে সন্তুষ্ট হতে চায় না; তারা দেখতে চায় কত টাকা বিনিয়োগ এলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে তার বাস্তব প্রভাব কতটুকু পড়বে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অথচ চীন সফরের পর এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা সামনে না আসায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই সফরের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে এবং এর সুফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। তবে সমালোচকদের পাল্টা প্রশ্ন—যে অর্জন আজ দৃশ্যমান নয়, যার অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও অনিশ্চিত, তাকে কি সত্যিই যুগান্তকারী সাফল্য বলা যায়?
দেশের জনগণ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি, তখন তারা বিদেশ সফরের সংবাদে করতালির চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে আগ্রহী। কারণ কূটনৈতিক সফরের সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপা হয় সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য দিয়ে নয়, বরং দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তার বাস্তব অবদান দিয়ে।
তাই চীন সফর শেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনও রয়ে গেছে—বহুল আলোচিত এই সফর থেকে বাংলাদেশ ঠিক কী পেল? দুই চুক্তি ও ১৩ সমঝোতা স্মারকের বাইরে দেশের অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য কী বাস্তব অর্জন এসেছে, তার উত্তরই এখন খুঁজছে সাধারণ মানুষ।