প্রসূতি ছুটি সীমিত করার বিধান কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়: হাইকোর্টের রুল
By বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২৬
কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা সীমিত করার আইনি বিধান নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একজন নারী কর্মী দুবারের বেশি প্রসূতি ছুটি পাবেন না এবং কোনো প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ছয় মাস চাকরি না করলে মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারী হবেন না—
এমন বিধানগুলো কেন বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
সোমবার (২৯ জুন) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের এবং বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
যে বিধানগুলো চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে
গত ১৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জনস্বার্থে রিট আবেদনটি দায়ের করেন।
- এতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর)-এর ১৯৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী, একজন সরকারি নারী কর্মচারী তাঁর পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার প্রসূতি ছুটি ভোগ করতে পারবেন।
- ফলে তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে তিনি আর কোনো প্রসূতি ছুটি বা সংশ্লিষ্ট সুবিধা পাবেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ৪৬(১) ও ৪৬(২) ধারা অনুযায়ী,
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো নারী কর্মী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ছয় মাস চাকরি না করলে মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারী হবেন না। একই সঙ্গে প্রসবের সময় তাঁর যদি দুটি
জীবিত সন্তান থাকে,
- তাহলে পরবর্তী সন্তানের জন্য তিনি আর প্রসূতি ছুটি পাবেন না।
- আদালতের নির্দেশনাশুনানি শেষে
- হাইকোর্ট চার সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
- রিটে বিবাদী করা হয়েছে—* মন্ত্রিপরিষদ সচিব*
- আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব*
- জনপ্রশাসন সচিব*
নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব* সমাজকল্যাণ সচিব*
স্বাস্থ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।
বিধানগুলো বৈষম্যমূলক ও অমানবিক
শুনানি শেষে আইনজীবী ইশরাত হাসান সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মজীবী নারীদের জন্য সমান মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তাও রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কর্মজীবী সব নারীর জন্য একটি অভিন্ন মাতৃত্বকালীন ছুটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, সে বিষয়েও আদালত রুল জারি করেছেন।
তিনি বলেন,“একজন নারী প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়—যে সন্তানই জন্ম দিন না কেন, প্রতিবারই তাঁর প্রসবজনিত শারীরিক ঝুঁকি, চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং নবজাতকের যত্নের প্রয়োজন সমান থাকে। শুধু সন্তানের সংখ্যা বা চাকরির মেয়াদের অজুহাতে তাঁকে এই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বৈষম্যমূলক, অযৌক্তিক এবং বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।”
আইনজীবীদের মতে, শ্রম আইনের বিদ্যমান বিধানের কারণে অনেক নারী চাকরি পরিবর্তনের পর ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সন্তানসম্ভবা হলে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের ভাষ্য, এ ধরনের বিধান কর্মজীবী নারীদের জন্য অত্যন্ত অমানবিক ও বৈষম্যমূলক।হাইকোর্টের এ রুলের পর এখন নজর থাকবে রাষ্ট্রপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবের দিকে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে তারা এসব বিধানের পক্ষে কী আইনি ও সাংবিধানিক যুক্তি উপস্থাপন করে, সেটিই হবে মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।