শুভ জন্মাষ্টমী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: সম্প্রীতির আলোয় ঘুচুক অন্ধত্ব
By মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
জন্মাষ্টমী, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং আমাদের বাংলাদেশসনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুভ জন্মাষ্টমী।
পরম অবতার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি হিসেবে দিনটি পালিত হয়ে আসছে গভীর আনন্দ, ভক্তি ও নানা ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে। শ্রীকৃষ্ণ কেবল সনাতন সম্প্রদায়ের এক পূজনীয় অবতারই নন, তিনি শান্তি, প্রেম, জ্ঞান ও ন্যায়ের প্রতীক। কিন্তু জন্মাষ্টমীর মূল দর্শনকে যদি আমরা শুধু একটি বিশেষ ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এর অন্তর্নিহিত বাণীর গভীরে প্রবেশ করি, তবে দেখব এর আবেদন সার্বজনীন—বিশেষ করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা গঠনে এর শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পৌরাণিক ইতিহাস ও সনাতন ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে যখন রোহিণী নক্ষত্রের প্রভাব থাকে, তখন মথুরার কারাগারে জন্ম নিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সে সময় মথুরার অত্যাচারী রাজা কংস তাঁর বোন দেবকী ও ভগ্নিপতি বসুদেবকে কারাবন্দী করে রেখেছিলেন, কারণ আকাশবাণী হয়েছিল—দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানের হাতেই কংসের পতন ঘটবে। অশুভ শক্তি, অত্যাচার ও শোষণের এমন এক চরম অন্ধকার সময়ে আবির্ভূত হয়েছিল মুক্তির আলো।
কংসের কারাগারের সেই কঠিন শৃঙ্খল ভেঙে, যমুনার উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে শিশু কৃষ্ণকে নিরাপদে গোকুলে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে শুভশক্তির বিজয়ের ইতিহাস রচিত হয়েছিল। জন্মাষ্টমী তাই কেবল একটি জন্মোৎসব নয়; এটি অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে ন্যায়ের চিরন্তন জয়ের ঐতিহাসিক স্মরণ।
শ্রীকৃষ্ণের শৈশব কেটেছিল বৃন্দাবন ও গোকুলে, যা চিরকাল মানুষের মনে নির্মল আনন্দ ও প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। মা যশোদার সাথে তাঁর বাল্যলীলার গল্প, গোপালরূপের নানা দুষ্টুমি, রাখাল বন্ধুদের সাথে মাঠে গরু চড়ানো, আর যমুনাতীরে বাঁশির সুরে পুরো প্রকৃতিকে বিমোহিত করার মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশব হয়ে উঠেছে লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। কৃষ্ণের সেই শৈশবের কোনো ভেদাভেদ ছিল না;
গোয়ালা, রাখাল থেকে শুরু করে সাধারণ প্রান্তিক মানুষের সঙ্গেই ছিল তাদের সহজ সখ্য। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের মধ্য দিয়ে তিনি শৈশবেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, প্রকৃত শক্তি অহংকার বা রাজমুকুটে নয়, বরং ভালোবাসা, সরলতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে নিহিত।শ্রীকৃষ্ণের পুরো জীবনদর্শন এবং বিশেষ করে মহাগ্রন্থ গীতার মূল সুর হলো অন্যায়, অসত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। আজকের এই অস্থির ও পরিবর্তনশীল সময়ে দাঁড়িয়ে জন্মাষ্টমীর এই চিরন্তন বার্তা আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সাম্প্রদায়িকতা, বিভেদ, উগ্রতা এবং সংকীর্ণতা যখনই সমাজকে গ্রাস করতে চায়, তখনই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধের আলোই হতে পারে একমাত্র পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদী ও বহুমুখী সংস্কৃতির দেশ। এ দেশের মাটি ও বাতাসে মিশে রয়েছে আবহমানকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গৌরবময় ইতিহাস।
এ দেশের প্রতিটি জাতীয় আন্দোলনে, বীর ভাষা আন্দোলনে, মহান মুক্তিযুদ্ধের এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য নয়; বরং সব ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও মতের মানুষের রক্তস্রোতে অর্জিত হয়েছিল এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মাঝেমধ্যে কিছু কুচক্রী মহল রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালায়। তারা ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে চায়। অথচ আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো উৎসবের সার্বজনীনতা। শারদীয় দুর্গোৎসব, পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা জন্মাষ্টমী—এ দেশের সাধারণ মানুষ সব সময়ই সব উৎসবে শামিল হয়ে এসেছে। এই উৎসবগুলো কেবল একটি নির্দিষ্ট গোত্রের বা সম্প্রদায়ের নয়, বরং এগুলো আমাদের সামগ্রিক লোকজ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শ্রীকৃষ্ণ গীতায় কর্মফল ও মানবকল্যাণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, জীবের সেবা এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রতিটি ধর্মেরই মূল শিক্ষা।
আজ জন্মাষ্টমীর এই পবিত্রলগ্নে আমাদের শপথ নেওয়া উচিত, কোনো ধরনের অন্ধত্ব, বিদ্বেষ বা সাম্প্রদায়িক উসকানি যেন আমাদের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে কলুষিত করতে না পারে।
রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত এমন এক সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয় নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে ও নিরাপদে তার উৎসব পালন করতে পারবে।
ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এবং রাষ্ট্র সবার—এই চিরন্তন সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা এবং সৌহার্দ্যই পারে একটি প্রগতিশীল, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী আমাদের মনে করিয়ে দিক সেই ঐক্যের বাণী, যেখানে সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে ভালোবাসার সেতু রচিত হয়।
সবার জন্য শুভ জন্মাষ্টমী।