সাংবাদিকতার কণ্ঠস্বর ও স্বাধীনতা রক্ষায় বৈশ্বিক বিনিয়োগ জরুরি: বারবারা মাসিং
By বেঙ্গল টাইমস আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বর্তমান বিশ্বে স্বাধীন সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা এবং এর কণ্ঠস্বরকে সোচ্চার রাখা গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন ডয়চে ভেলের (ডিডাব্লিউ) মহাপরিচালক বারবারা মাসিং। জার্মানির বন শহরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘ডিডাব্লিউ গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম ২০২৬’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।
শতাধিক দেশের এক হাজারেরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘নির্ভীক, সোচ্চার সাংবাদিকতা’ (জার্নালিজম আউট লাউড)। উদ্বোধনী বক্তব্যে বারবারা মাসিং বর্তমান সময়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, এর ভবিষ্যৎ এবং ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জগুলোর নানা দিক বিশদভাবে তুলে ধরেন।
ভুয়া তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) চ্যালেঞ্জবারবারা মাসিং তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। একদিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীগুলো জনমতকে প্রভাবিত করছে, অন্যদিকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অ্যালগরিদম তথ্যের সত্যতা যাচাই না করেই স্রেফ মুনাফা বা নির্দিষ্ট মতবাদ ছড়াতে আবেগপূর্ণ বিষয়ের প্রচার বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রয়টার্সের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের সূত্র ধরে তিনি বলেন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষ খবর পড়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই (AI) চ্যাটবটকে মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য মানুষ এখনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের ওপরই ভরসা রাখছে।
সাংবাদিকদের ওপর বৈশ্বিক নিপীড়নবিশ্বজুড়ে স্বৈরাচারী শাসকদের উত্থান এবং রাজনৈতিক-
অর্থনৈতিক স্বার্থে সত্যকে বলি দেওয়ার প্রবণতায় সাংবাদিকতা দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে
উঠছে বলে সতর্ক করেন ডিডাব্লিউর মহাপরিচালক। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫০০ জনের বেশি সাংবাদিক কারাগারে বন্দী রয়েছেন। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’–এর তথ্য অনুযায়ী, দিন দিন বহু সাংবাদিক নির্বাসনে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি নির্বাসনে গিয়েও স্বৈরাচারী সরকারগুলোর ‘সীমান্তহীন নিপীড়ন’ বা ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনের কারণে তাঁরা নিরাপদ থাকতে পারছেন না।
হংকংয়ের গণতন্ত্রকামী বন্দী সাংবাদিক জিমি লাই এবং তুরস্কের কারাবরণকারী সাংবাদিক আলি ওদুয়ানের সাহসিকতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে এখন চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।
১ ডলার বিনিয়োগে ১০০ ডলারের সুফলমানসম্পন্ন সাংবাদিকতার জন্য আর্থিক
কাঠামোর ওপর জোর দিয়ে বারবারা মাসিং বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এআই সিস্টেমগুলো সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহার করে বিপুল সুবিধা নিচ্ছে। তাই কনটেন্ট নির্মাতাদের আয়ের অংশ নিশ্চিত করতে একটি টেকসই ব্যবসায়িক মডেল প্রয়োজন।
ডিডাব্লিউ একাডেমি, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট মিডিয়া এবং ইউনেসকোর যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন ‘দ্য ভ্যালু অব জার্নালিজম’ (সাংবাদিকতার মূল্য)–এর তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিনিয়োগ করা প্রতি ১ মার্কিন ডলার সমাজের জন্য ১০০ ডলারের বেশি সুফল বয়ে আনে।
এটি দুর্নীতি কমাতে, তছরুপ হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং উন্নত সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। অপরদিকে, অপতথ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর সমাজের ৩৫০ থেকে
৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল
সমাজকে আরও সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন—
"সাহস না থাকলে সাংবাদিকতা নীরব হয়ে যায়। আর আমরা তা কিছুতেই হতে দিতে পারি না। আসুন, আমরা উচ্চকণ্ঠ হই। আমরা আরও সাহসী হই।"