হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ১৬, ২০২৬

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে রাষ্ট্রনির্মাণের অভিযাত্রা: শেখ হাসিনা, সংগ্রাম, উন্নয়ন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা (১৯৮১–২০২৬)

By  অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী মানিক।

IMG_5806

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন কেবল একটি তারিখ নয়, একটি জাতির আবেগ, আশা এবং নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তেমনই একটি দিন—যেদিন দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সেই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর দেশে ফেরা ছিল না; এটি ছিল এক রক্তাক্ত ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহনের শপথ, এক ভগ্ন সংগঠনকে পুনর্গঠনের অঙ্গীকার এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানোর পর শেখ হাসিনা ছিলেন এক শোকাহত কন্যা। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তিনি পরিণত হন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীকে। ১৯৮১ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ যাত্রায় রয়েছে সংগ্রাম, কারাবরণ, হামলা-মামলা, ক্ষমতা, উন্নয়ন, বিতর্ক, সাফল্য, সমালোচনা এবং এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা।

১৯৮১: এক শোকাহত কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

১৯৮১ সালের ১৭ মে, প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাখো মানুষের ভালোবাসার মাঝে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। তখন বাংলাদেশে সামরিক ও আধাসামরিক শাসনের ছায়া; আওয়ামী লীগ ছিল নেতৃত্ব সংকটে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দলটি দিশাহীন হয়ে পড়েছিল।

বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দেশে ফিরে তিনি ঘোষণা করেছিলেন

“আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হতে আসিনি, আমি আপনাদের বোন হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে এসেছি।”

এই প্রত্যাবর্তন অনেকের কাছে ছিল হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত। আবার সমালোচকদের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক নেতৃত্বের আরও দৃঢ় প্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের মূল্যায়নে দুই দৃষ্টিভঙ্গিই আলোচনার অংশ।

সংগ্রামের রাজনীতি: রাজপথ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা

১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথ সহজ ছিল না। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি এবং বিরোধী রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাকে এগোতে হয়। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি গঙ্গা পানিচুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন।

২০০১–২০০৮ সময়কাল ছিল রাজনৈতিক সংঘাত, তীব্র বিরোধিতা এবং সহিংসতার অধ্যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনীতির এক ভয়াবহ স্মৃতি। শেখ হাসিনা সেই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও বহু নেতাকর্মী নিহত হোন।

২০০৯–২০২৬: উন্নয়ন, রাষ্ট্রগঠন ও দীর্ঘ ক্ষমতার অধ্যায়

২০০৯ সালে ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনার সরকার “ডিজিটাল বাংলাদেশ” ধারণা সামনে আনে। পরবর্তী প্রায় ১৭ বছরে বাংলাদেশে দৃশ্যমান কিছু বড় অবকাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে।

উন্নয়নের আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে—

  • পদ্মা সেতু নির্মাণ
  • মেট্রোরেল
  • কর্ণফুলী টানেল
  • বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি
  • ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ
  • সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি
  • নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষায় অগ্রগতি

সমর্থকদের মতে, বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জলবায়ু কূটনীতি, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ নতুন পরিচিতি পায়।

তবে সমালোচকরাও প্রশ্ন তুলেছেন—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ নিয়ে। ১৭ বছরের শাসন নিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে-বাইরে নানা ধরনের মূল্যায়ন রয়েছে।

ভুল, সীমাবদ্ধতা ও আত্মসমালোচনার প্রশ্নযে কোনো দীর্ঘ শাসনামলে ভুলত্রুটি থাকেই—এমন মন্তব্য অনেক রাজনৈতিক 

বিশ্লেষকের। আওয়ামী লীগের ভেতরেও বিভিন্ন সময় দলীয়করণ, তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব, কিছু নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং জনঅসন্তোষ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।অনেকের মতে, উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করা গেলে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়ানো গেলে সরকারের সাফল্য আরও দৃঢ় হতে পারত।

 অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের যুক্তি—রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, জঙ্গিবাদ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও উন্নয়ন ধরে রাখা সহজ ছিল না।৫ আগস্ট ও দেশের বাইরে অবস্থান: বিতর্কিত এক অধ্যায়

.

আপনার উল্লেখ করা “৫ আগস্ট দেশের বাইরে চলে যাওয়া” প্রসঙ্গটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন, আবার কেউ কঠোর সমালোচনা করেন। এ ধরনের বিষয়ে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করা জরুরি।

আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থা ও জনমানুষের প্রত্যাশা

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হলেও দলটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে—সংগঠন পুনর্গঠন, জনআস্থা ধরে রাখা, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার নতুন বাস্তবতা মোকাবিলা।

একটি অংশ মনে করে, দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বা তার নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। আবার আরেক অংশ রাজনৈতিক সংস্কার, অধিক অংশগ্রহণমূলক শাসন ও নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা—স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন।

স্বাধীনতার চেতনা, রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” এবং “স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি” নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, আর বিরোধীরা এই বয়ানের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক আস্থার ওপর।

উপসংহার

১৯৮১ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন থেকে ২০২৬—শেখ হাসিনার রাজনৈতিক যাত্রা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই যাত্রায় যেমন আছে ত্যাগ, সংগ্রাম, উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের গল্প; তেমনি আছে বিতর্ক, সমালোচনা ও অপূর্ণতার প্রশ্ন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস তাই কেবল একজন নেত্রীর দেশে ফেরার স্মৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, উন্নয়ন বিতর্ক, গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পথচলারও প্রতীক। ইতিহাস শেষ কথা বলে না—ইতিহাস প্রতিনিয়ত নতুন প্রশ্ন তোলে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে জনগণ, সময় এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।