পদ্মা সেতুর চার বছর পূর্তি ও শেখ হাসিনার অদম্য নেতৃত্বের বিজয়গাথা
By মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।
পদ্মা সেতু কেবল ইস্পাত-কংক্রিটের তৈরি একটি অবকাঠামো নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, অদম্য সাহস ও সক্ষমতার এক অবিনশ্বর প্রতীক। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর চার বছর পূর্তিতে আজ যখন আমরা এর অর্জনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে এর রূপকার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নাম। ২০২২ সালের ২৫ জুন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই সেতুর দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।
পদ্মা সেতুর নির্মাণকাহিনি ছিল এক অসম লড়াইয়ের ইতিহাস। বিশ্বব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল যখন নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে এই প্রকল্পকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিচল থেকে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
অথচ সেই দুর্দিনে বিএনপি ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ একটি মহল উন্নয়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে থামিয়ে দিতে মরিয়া ছিল। বিএনপি নেতারা সে সময় ভিত্তিহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রকল্পটিকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
অন্যদিকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিশ্বব্যাংককে অর্থায়ন থেকে সরিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা চেয়েছিলেন বাংলাদেশ যেন নিজস্ব সক্ষমতায় এই সেতু নির্মাণ করতে না পারে।
কিন্তু সব ষড়যন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে এই মহাযজ্ঞ বাস্তবায়ন করেন। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি ১৮.১৮ মিটার প্রশস্ত এবং এর মোট স্প্যান সংখ্যা ৪১টি।
পদ্মা সেতুর মোট নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি’ এই সেতু নির্মাণের মূল দায়িত্ব পালন করে। সেতুর বহুমুখী ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে এটি ‘ডাবল-ডেক’ বা দোতলা বিশিষ্ট করা হয়েছে—যার ওপরের তলায় যানবাহন এবং নিচের তলায় রেলপথ চলাচল করছে।
পদ্মা সেতুর মতো প্রমত্তা নদীতে পাইলিং করা ছিল বিশ্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং প্রকৌশল কাজ। ১২৭ মিটার গভীরে পাইলিং করার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই সেতুকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আজ এই সেতু কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং মোংলা, পায়রা বন্দর এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের কার্যক্রমকে গতিশীল করে দেশের জিডিপিতে অসামান্য অবদান রাখছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাঙালির আস্থা ও ভালোবাসার ঠিকানা শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। শারীরিক উপস্থিতিতে তিনি হয়তো বর্তমানে নেই, কিন্তু পদ্মা সেতুর প্রতিটি পিলারে, প্রতিটি স্প্যানে এবং দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রতিটি হাসিতে তাঁর সাহসের প্রতিধ্বনি মিশে আছে। মানুষ যখনই এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করে, তারা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় সেই সাহসী সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করে। এটি কোনো রাজনৈতিক আবেগের চেয়েও বেশি কিছু—এটি উন্নয়নমুখী বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ের কথা।রাজনৈতিক সমালোচকদের সব নেতিবাচক মন্তব্য বা ষড়যন্ত্রের সুর আজ পদ্মা সেতুর সুফলের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। বিএনপি ও ড. ইউনূস মহলের সেই সময়কার বিতর্কিত ও নেতিবাচক অবস্থান আজ ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি ব্যর্থ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। কারণ উন্নয়নের সুফল কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি জনগণের সম্পদ। সময় ও পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু জাতির জন্য যে স্বপ্ন শেখ হাসিনা বাস্তবায়ন করে গেছেন, তা কখনোই মুছে যাওয়ার নয়। ষড়যন্ত্রের সব মেঘ কাটিয়ে পদ্মা সেতু আজও অটুট দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের আলোকবর্তিকা হয়ে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শেখ হাসিনার অদম্য নেতৃত্বের কথা জানান দেবে।