রংপুরের চার খুন: পুলিশের দাবি ও ময়নাতদন্তে ভিন্ন তথ্য, তদন্তের ভার ডিবিতে
By নিজস্ব প্রতিবেদক | বেঙ্গল টাইমস
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক ব্যাখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
হত্যার কারণ এবং মরদেহের অবস্থা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে বেশ কিছু অমিল সামনে এসেছে।এদিকে পুলিশের দাবি প্রত্যাখ্যান করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্তের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
একই দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদ ও মহানগর নাগরিক কমিটি।
ঘটনার তদন্ত আরও গভীরভাবে করার জন্য মামলাটি কোতোয়ালি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)তে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবক গ্রেপ্তার
গত শনিবার রাতে নগরীর কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ভোরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় দুই যুবক সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাসকে (২৩) আটক করার কথা জানায় পুলিশ। তাদের বাড়ি নিহত পরিবারের বাসার কাছেই।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ দাবি করেন, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই দুই যুবক চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর অভিযুক্তরা কিছু সময় ওই বাড়িতেই অবস্থান করে। তারা গোসল করে, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খায় এবং নিজেদের মোবাইল ফোন পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করে।
হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পর্যন্ত তারা সেখানে ছিল বলেও জানানো হয়।
রোববার রাতে আদালতে দুই যুবক ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য নিয়ে আপত্তি
পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলছেন নিহত পরিবারের স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা।
তাদের অভিযোগ, চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ আড়াল করে দুই যুবককে মূল আসামি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, চারজনকে হত্যার পর অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেছে, গোসল করেছে এবং খাবার খেয়েছে—পুলিশের এমন বর্ণনা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।তিনি দ্রুত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং নেপথ্যে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
ময়নাতদন্তের তথ্যেও দেখা দিয়েছে ভিন্নতা
মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতদের মুখমণ্ডলের বিকৃত অবস্থা দেখে রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছিল।
তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, মরদেহে অ্যাসিড বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে পোড়ানোর আলামত পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, নিহত আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল ভেঙে যাওয়া বা চোখ বের হয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি।
তবে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
চিকিৎসকের মতে, মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় রক্ত ও টিস্যুর স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে মুখমণ্ডল কালচে ও বিকৃত দেখাতে পারে।
তিন দিনের সময় বেঁধে দিল আন্দোলনকারীরা
পুলিশের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে সোমবার রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।
পরে তারা নগরীর কাছারি বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান। এতে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়।
বিক্ষোভকারীরা প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ঘটনার নেপথ্যের কারণ দ্রুত প্রকাশের দাবি জানান।
তারা পুলিশকে তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বলেন, এর মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
রংপুর জেলা মহিলা পরিষদও একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে।
সংগঠনটির নেতারা পুলিশের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।এদিকে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকেও মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সংগঠনটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।
তদন্তের দায়িত্ব ডিবির হাতে
বিতর্ক ও নানা প্রশ্নের মধ্যেই মামলাটির তদন্তভার পরিবর্তন করা হয়েছে।
অধিকতর তদন্তের জন্য চার হত্যার মামলা কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রংপুর মহানগর ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, মামলাটি বিস্তারিতভাবে তদন্তের উদ্দেশ্যেই ডিবির কাছে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি মামলার নথিপত্র ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেন। ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরে পুরোনো ও নতুন তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
এ সময় আগের তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্তের অগ্রগতি ও ঘটনাস্থলের বিভিন্ন তথ্য নতুন কর্মকর্তাকে জানান।
ডিবির উপকমিশনার বলেন,
পুলিশ কমিশনারের দেওয়া ঘটনার বিবরণের সঙ্গে আদালতে দুই আসামির দেওয়া জবানবন্দির বেশ কিছু মিল রয়েছে।
তবে জবানবন্দিতে কিছু নতুন তথ্যও পাওয়া গেছে। সেসব বিষয় যাচাইসহ পুরো ঘটনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতেই তদন্ত ডিবিতে দেওয়া হয়েছে।
এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার দুই যুবকের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু এবং এর বাইরে অন্য কেউ জড়িত কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে রংপুরের আলোচিত এই চার খুনের তদন্ত কোন দিকে এগোয়।