জ্বালানি সংকটে স্থবির শিল্পখাত: হুমকির মুখে উৎপাদন ও রপ্তানি
By বিশেষ প্রতিনিধি, বেঙ্গল টাইমস:
দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করায় শিল্প খাতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে কারখানা।
তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইস্পাত, খাদ্য, সিমেন্ট ও অন্যান্য উৎপাদন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।জ্বালানি সংকটের কারণে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে কারখানা পরিচালনার ব্যয়। এতে রপ্তানি কার্যক্রমে সময়সূচি মেনে পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মসংস্থান ও দেশের সামগ্রিক শিল্প উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
উৎপাদনে বড় ধাক্কা
শিল্প খাতে সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের বড় ব্যবধান। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও একপর্যায়ে সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ১৯৩ কোটি ঘনফুটে।
সাময়িকভাবে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি। জ্বালানি সংকটে মেঘনা গ্রুপের চিনি, তেল, আটা ও সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্যের ৫৭টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
টি কে গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নাবিল গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন সক্ষমতা কমে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া বিএসআরএমের ১০টি কারখানা এবং হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পকারখানা পুরোপুরি বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে। নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ
সাম্প্রতিক সময়ে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
এতে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। একই সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো খালাসে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি গত এক দশকে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানিনির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব
গ্যাসের সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এর প্রভাব পড়ছে শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহে।বিশেষ করে টেক্সটাইল ও স্পিনিং কারখানাগুলো সংকটে পড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বয়লার পরিচালনার জন্য যেখানে প্রায় ৮ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে অনেক কারখানা মাত্র ২ থেকে ৩ পিএসআই চাপ পাচ্ছে।
ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখার চেষ্টা করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যয় বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।
রপ্তানি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি—বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলুর ভাষ্য অনুযায়ী, পোশাক কারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হলেও স্পিনিং মিলগুলো তীব্র সমস্যার মুখে পড়েছে।
গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পিত রেশনিংয়ের দাবি
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, হঠাৎ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের চাপ কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে রেশনিং করা প্রয়োজন।
কোন এলাকায় কখন কত সময় গ্যাসের চাপ কম থাকবে, সে বিষয়ে আগে থেকে শিল্পকারখানাগুলোকে জানানো হলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা সহজ হবে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বর্তমান জ্বালানি সংকট শুধু উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।