বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কার্যকর: স্বস্তি না সংকট? জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
By বেঙ্গল টাইমস প্রতিবেদক
দেশব্যাপী নতুন বিদ্যুৎ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) জুন মাস থেকে নতুন বিদ্যুৎ মূল্য কাঠামো কার্যকর করেছে, যার ফলে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। এই সিদ্ধান্তকে সরকার ও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও ভোক্তাদের বড় একটি অংশ এটিকে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির নতুন চাপ হিসেবে দেখছেন।
BERC-এর ঘোষণায় খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রায় ১৬.৬৮ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ১৯.৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন গ্রাহক শ্রেণিতে বিদ্যুতের দাম ১৫ থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সাধারণ মানুষের উদ্বেগ
নতুন শুল্ক কার্যকরের পর মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে অনেক ভোক্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাজারে পণ্য ও সেবার মূল্যও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়লে শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রাজধানীর এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, “নিত্যপণ্যের দাম আগেই অনেক বেশি। এখন বিদ্যুতের বিলও বাড়লে মাসিক বাজেট সামলানো আরও কঠিন হয়ে যাবে।”
শিল্প ও ব্যবসা খাতের প্রতিক্রিয়া
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী শিল্পে বিদ্যুৎ একটি বড় ব্যয় উপাদান।
ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারেও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।
সরকারের যুক্তি
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত আমদানিকৃত জ্বালানি, এলএনজি, কয়লা এবং তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকির চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপ কমাতে এবং বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন ছিল।
BERC-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ সংস্থাগুলোর আর্থিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য আংশিক স্বস্তি
মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর সমালোচনার মুখে BERC পরে একটি সংশোধিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এতে লাইফলাইন গ্রাহক এবং মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য পূর্বের হার বহাল রাখা হয়। ফলে নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেয়েছে।
BERC জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে গড় খুচরা বিদ্যুৎ শুল্ক কিছুটা কমে এসেছে এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ খাতে চাপের মুখে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে খরচ কমানো সম্ভব হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
সামনে কী?
বিদ্যুতের নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার ফলে
আগামী কয়েক মাসে এর প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
একদিকে সরকার বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার কথা বলছে,
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
দিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে,
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যদি সেবার মান উন্নয়ন,
নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা যায়,
তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নতুন শুল্ক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই মনে করছেন অনেকে।