হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published জুলাই ২৫, ২০২৬

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য: তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ কোটির বেশি অনিয়ম, অবৈধ ১১১ শিক্ষক নিয়োগ

By বেঙ্গল টাইমস | নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬

IMG_8432

রাজধানীর ঢাকা সিটি কলেজ, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ এবং নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় ১০ কোটিরও বেশি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। 

তদন্তে তিন প্রতিষ্ঠানে মোট ১১১ জন শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগকেও বিধিবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ডিআইএ তিনটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে অনিয়মের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।

মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে ৫ কোটির বেশি অনিয়ম

তদন্তে উঠে এসেছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি নীতিমালায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও সেশন ফি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেছে।

গত আট বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করে প্রায় ৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।এছাড়া ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরীক্ষার সম্মানীসহ বিভিন্ন খাতে ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বেতন-ভাতা প্রদান এবং উন্নয়ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় ভ্যাট-কর কর্তন না করার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

ডিআইএর প্রতিবেদনে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের নিয়োগকে অবৈধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে দেখা যায়, তিনি একই সময়ে দুটি কলেজে কর্মরত থেকে উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন, যা সরকারি চাকরির বিধির পরিপন্থী।এছাড়া ২০১৮ সালে কেনা কলেজের মাইক্রোবাস সাত বছর ধরে কোনো লগবই ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে।

এ সময়ে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হলেও এর কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি।

ঢাকা সিটি কলেজে ১০৫ শিক্ষকের নিয়োগে অনিয়ম

ডিআইএর তদন্তে ঢাকা সিটি কলেজে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক নিয়োগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

নিয়োগ কমিটি গঠন ও গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রয়োজনীয় নথিও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি।তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে।

এছাড়া ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ৩১ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।ডিআইএ আরও জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিধিবহির্ভূতভাবে গভর্নিং বডির সদস্যরা ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ করেছেন। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় জাল সনদে চাকরি

নরসিংদীর মনোহরদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ, বেতন-ভাতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ।

জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) যাচাই করে জানিয়েছে, দুই শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ জাল।

তদন্তে তাদের গ্রহণ করা সরকারি বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন শিক্ষকের নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সাত শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে প্রায় ৮৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২১ হাজার ৭০৮ টাকা ভ্যাট এবং ৭ হাজার ১০২ টাকা আয়কর জমা দেয়নি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ আদায়, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ম লঙ্ঘন এবং ১ দশমিক ৮২ একর জমি বেহাত হওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।

ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

ডিআইএ তিনটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই অনিয়মের মাধ্যমে আদায় বা ব্যয় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা,

অবৈধ নিয়োগ বাতিল, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং

আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

উল্লেখ্য, গত চার মাসে রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা করেছে ডিআইএ।

এর মধ্যে প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নিরীক্ষা ও কার্যকর তদারকির কোনো বিকল্প নেই।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক বার্তা যাবে।

একই সঙ্গে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, অর্থ আত্মসাৎ ও সরকারি বিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে

জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়,

এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

তদন্তের সুপারিশ কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম কমে আসবে এবং

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে একের পর এক অনিয়মের চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। 

  • সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিয়মিত নিরীক্ষা ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। 
  • বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, আর্থিক লেনদেন এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। 
  • তদন্তে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে,
  • সেসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও তা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
  • একই সঙ্গে অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ বা অপব্যবহার হওয়া অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। 
  • শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে 

তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দিয়েছেন শিক্ষা বিশ্লেষকরা। 

তারা বলছেন, শুধু তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করলেই হবে না,

সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে

এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।