কমছে ডলারের দাম, রেমিট্যান্সে স্বস্তি বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে
By বেঙ্গল টাইমস ডেস্ক, ১৬ আগস্ট ২০২৬
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরছে। ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাজারে মার্কিন ডলারের দর কিছুটা কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি ব্যয়ের চাপ কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এই পরিস্থিতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার নেমে এসেছে ১২২ টাকা ৬৩ পয়সায়। একই দিনে স্পট মার্কেটে ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৩ টাকা দরে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও স্পট মার্কেটে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা।
অর্থাৎ মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে ডলারের দাম কমেছে ৮২ পয়সা। এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন এবং ঋণপত্রের (এলসি) দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রতি ডলারের জন্য দিতে হচ্ছে ১২৩ টাকা ৫ পয়সা।
আগস্টের শুরুতে এই দর ছিল ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা। ফলে চলতি মাসেই এ বাজারে ডলারের দর কমেছে ৯০ পয়সা।
রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি
বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রবাসী আয় বৃদ্ধিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আগস্টের প্রথম ১২ দিনে দেশে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে।
গত বছরের একই সময়ে এসেছিল প্রায় ১০৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি আগস্টের প্রথম ১২ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।
ব্যাংকারদের মতে, রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের জোগান বাড়িয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের চাপও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
একই সময়ে বড় ধরনের আমদানি দায় পরিশোধের চাপ কমে আসায় বাজারে ডলারের অতিরিক্ত চাহিদাও তৈরি হচ্ছে না।
আমদানি ব্যয়ের চাপও কিছুটা কমেছে
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও উত্তেজনার কারণে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল।
এতে দেশে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি দায় পরিশোধের চাপ কিছুটা কমেছে।
পাশাপাশি রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ডলারের বিনিময় হারেও।
খোলা বাজারে এখনো বেশি দর
তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের দাম কমলেও খোলা বাজারে একই মাত্রায় এর প্রভাব পড়েনি।
রোববার রাজধানীর মতিঝিলের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১২৬ টাকা ৭০ পয়সায় কেনা হয়েছে।
আর বিক্রি হয়েছে ১২৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে।ফলে আন্তঃব্যাংক বাজারের সঙ্গে খোলা বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান এখনো চার টাকার বেশি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও খোলা বাজারে ডলারের অতিরিক্ত চাহিদা পুরোপুরি কমেনি।
সামনে কী হতে পারে
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ডলারের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু রেমিট্যান্স বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়।
আমদানি ও রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক ডলার চাহিদার ওপরও নজর রাখতে হবে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম আবার বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে যদি আমদানি চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তাহলে ডলারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহ এবং তুলনামূলক কম আমদানি দায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রেখেছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে ডলারের বাজারে আরও স্থিতিশীলতা আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডলারের দর কমে স্থিতিশীলতা বাড়লে আমদানিকারকদের ব্যয় কমার পাশাপাশি আমদানি-নির্ভর পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের মূল্যেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সুফল ভোক্তা পর্যায়ে কতটা দ্রুত পৌঁছাবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর।