সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে লোডশেডিংয়ের মহাদুর্যোগ: দিনে ২০ ঘণ্টাই বিদ্যুৎহীন জনজীবন
By বেঙ্গল টাইমস, সুনামগঞ্জ | ১৭ জুন, ২০২৬
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা অসহনীয় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, বাকি ২০ ঘণ্টাই কাটছে অন্ধকারে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে।
থানীয় গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। দিনের যেকোনো সময় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী, শিশু ও বয়স্করা। বিশেষ করে তীব্র দাবদাহে জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
ব্যবসায়িক ও শিক্ষা খাতে ধস
বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিতে। তাহিরপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতা সমাগম কমে যাওয়ায় বেচাবিক্রি তলানিতে ঠেকেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মুতাকাব্বির মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, "ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ফ্রিজ চালানো যাচ্ছে না, মালামাল নষ্ট হচ্ছে।" একই চিত্র উপজেলার অন্যান্য বাজারেরও। অন্যদিকে, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
বাস্থ্যসেবা ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্থবিরতা
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হাসপাতালটিতে জেনারেটর থাকলেও তা দীর্ঘ দিন ধরে অকেজো। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাশাদ আহমেদ বলেন, "বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর মেরামতের জন্য স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো সাড়া মেলেনি।"
এছাড়া ব্যাংকিং সেবাতেও দেখা দিয়েছে জটিলতা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক অমর সরকার বলেন, "চাকরি জীবনের ৩৫ বছরে এমন ভয়াবহ লোডশেডিং দেখিনি। জেনারেটরের ওপর ভরসা করে কোনোমতে ব্যাংকিং কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছি।"
ঘাটতির কবলে বিদ্যুৎ সরবরাহ
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির এমন করুণ দশা সম্পর্কে তাহিরপুর বাদাঘাট পল্লী বিদ্যুৎ সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) আলাউল হক সরকার জানান, উপজেলায় প্রতিদিন ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট। তিনি বলেন, "বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির কারণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম হওয়ায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিলে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছি।"
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ
এদিকে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। জয়নাল আবেদীন ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহির উদ্দিন ফেসবুকে লিখেছেন, "২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না।" স্থানীয়রা অবিলম্বে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ সেবা না পাওয়ায় জনমনে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষ দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কি না—সেটাই এখন তাহিরপুরবাসীর বড় প্রশ্ন।