সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক: দলীয়করণের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন
By টাফ রিপোর্টার | বেঙ্গল টাইমস
মেধা বনাম রাজনৈতিক পরিচয়: গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় একের পর এক দলীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোতে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের একের পর এক নিয়োগের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রকাশিত এই তালিকায় দেখা গেছে, দেশের একাধিক সংবেদনশীল ও নীতিনির্ধারণী পদে এমন ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে, যাদের সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় পদবি রয়েছে।সমালোচকদের মতে, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর রাষ্ট্র সংস্কার ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছিল, বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার উল্টো চিত্র ফুটে উঠছে। রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্যতা, দক্ষতা এবং মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে এবং জনগণের ভোটাধিকার ও সুশাসনের প্রত্যাশা হোঁচট খায়।
নিয়োগ তালিকার আদ্যোপান্ত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং জনমনে আলোচনার জন্ম দেওয়া তালিকাটিতে স্থান পাওয়া উল্লেখযোগ্য নিয়োগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- ১. রাশেদুল হক
রাজনৈতিক পরিচয়: আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক,
বিএনপি নিয়োগকৃত পদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ভারতীজিস এনএমএস অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোরেমেল)
- ২. মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল
রাজনৈতিক পরিচয়: বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক,
বিএনপি নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন।
- ৩. এ টি এম আবদুল বারী দানী
রাজনৈতিক পরিচয়: সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক,
বিএনপি নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)
- ৪. মো. কামরুজ্জামান
রাজনৈতিক পরিচয়: সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি (দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত),
যুবদল নিয়োগকৃত পদ: নির্বাহী সচিব, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ।
- ৫. মো. সামসুল আলম
রাজনৈতিক পরিচয়: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার/পুনর্গঠন কমিটির সদস্য,
নিয়োগকৃত পদ: অতিরিক্ত সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।
- ৬. সালাহউদ্দিন সরকার
রাজনৈতিক পরিচয়: কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল,
নিয়োগকৃত পদ: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন
- ৭. আবদুল খালেক
রাজনৈতিক পরিচয়: রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপি,
নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন।
- ৮. শামসুজ্জামান (সুরুজ)
রাজনৈতিক পরিচয়: জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি
নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন।
- ৯. কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু)
রাজনৈতিক পরিচয়: সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
নিয়োগকৃত পদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট
- ১০. জাকির হোসেন (সিদ্দিকী)
রাজনৈতিক পরিচয়: সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, যুবদল
নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভোট বোর্ড।
- ১১. বেনজীর আহমেদ
রাজনৈতিক পরিচয়: ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপি
নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)
- ১২. মামুন হাসান
রাজনৈতিক পরিচয়: জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বিএনপি
নিয়োগকৃত পদ: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সংকট
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের এই সংস্কৃতি কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক ব্যাধি।
অতীতে প্রায় প্রতিটি সরকারই নিজেদের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে যখন রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্লোগান চারদিকে মুখরিত, তখন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এমন ব্যাপক নিয়োগের অভিযোগ জনমনে চরম হতাশা ও অনাস্থার জন্ম দিচ্ছে।বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর এবং জনকল্যাণমুখী করপোরেশনগুলোতে দলীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বসানো হলে তা স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এতে দলীয় স্বার্থ প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ওপর স্থান পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে।
সংশ্লিষ্ট মহলের নীরবতা
এ ধরনের বিতর্কিত ও রাজনৈতিক নিয়োগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে মুখ খোলা হয়নি, যা জনমনে ধূম্রজাল ও সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। কে কোন দলীয় পরিচয়ের লোক, তা না দেখে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রার্থীর উপযুক্ততা এবং অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে প্রকাশ করা গেলেই কেবল এই আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব।