বদলে যাওয়া সময়, থমকে থাকা বিচার: আইভি রহমানের রক্তভেজা স্মৃতি ও আমাদের মানবিক দায়
By মানিক লাল ঘোষসাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি
সময় তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। কিন্তু কিছু ক্ষত সময়ের প্রলেপেও শুকায় না। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার স্মৃতি আজও বাংলাদেশের বিবেকবান মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
সেই বর্বর হামলায় ২৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নারী আন্দোলনের অগ্রপথিক, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণীও ছিলেন।
হামলার পর তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ আগস্ট ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আইভি রহমান। তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারের ওপর নেমে আসা নানা প্রতিকূলতার স্মৃতি দুই দশকেরও বেশি সময় পর আজও বেদনাবিধুর হয়ে আছে।
আইভি রহমানের আসল নাম জেবুন্নাহার আইভি। তবে দেশজুড়ে তিনি ‘আইভি রহমান’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর আদরের ডাকনাম ছিল ‘আইভি’; অনেকেই তাঁকে স্নেহভরে ‘আইভি আপা’ বলে ডাকতেন।
১৯৩৪ সালের ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের ভৈরবের চণ্ডীবের গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। আট বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। তাঁর বাবা জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ এবং মা হাসিনা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
আইভি রহমানের রাজনৈতিক জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংগ্রামে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হন। ১৯৮০ সালে দায়িত্ব নেন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতির। ২০০২ সাল পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও নারী সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি ও জাতীয় মহিলা সংস্থার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করে নারীর ক্ষমতায়ন ও কল্যাণে ভূমিকা রাখেন। জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন এই নেত্রী।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকেও আইভি রহমান কখনো ক্ষমতা বা পদমর্যাদার অহংকার দেখাননি। বরং সাধারণ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর যোগাযোগ। মাঠপর্যায়ের মানুষের সঙ্গে সহজেই মিশে যাওয়ার এই গুণ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল।
কিন্তু সেই নেত্রীই পরিণত হন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার শিকার। তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারকে নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আইভি রহমানের ছেলে নাজমুল হাসান পাপনের বিভিন্ন সময়ের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ দিনের নানা ঘটনা। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, হামলার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তিনি পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা নার্স দেখতে পাননি বলে জানান। মাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ বাধা দিয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
পরে অনেকটা চেষ্টা করে আইভি রহমানকে সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানেও চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তাঁর স্বামী প্রয়াত জিল্লুর রহমানকেও দুই দিন আইভি রহমানকে দেখতে দেওয়া হয়নি বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে এই মামলার বিচারিক পরিণতির অপেক্ষায় ছিলেন নিহতদের স্বজনেরা। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আরও ১৯ জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এ ছাড়া আরও ১১ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল গ্রহণ করে নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করেন এবং সব আসামিকে খালাস দেন।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রাখেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকের বেশি সময় ধরে আলোচিত এই মামলার বিচারিক পরিণতি নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছায়।
ভৈরবের মাটি ও মানুষের সঙ্গে আইভি রহমানের সম্পর্ক ছিল গভীর। ভৈরবে অবস্থিত ‘আইভি ভবন’ আজও তাঁর স্মৃতি বহন করছে। স্থানীয় মানুষও তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেন।
কিন্তু আদালতের রায় বদল, আইনি প্রক্রিয়ার নানা বাঁক কিংবা রাজনৈতিক পালাবদল কি কখনো একজন মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা মুছে দিতে পারে? স্বজন হারানোর সেই আর্তনাদ কি কোনো রায়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব?
রাজনীতি বদলায়, সরকার পরিবর্তিত হয়, মতাদর্শের সংঘাত চলতে থাকে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াও তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের জীবন, রক্ত এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থেকে যায়।
একুশে আগস্টের সেই ভয়াবহতার দুই দশকেরও বেশি সময় পর আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন—রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার পালাবদল কিংবা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃত ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র ও সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
শহীদ আইভি রহমানের রক্তভেজা স্মৃতি আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—রাজনীতি যেন কখনো এতটা নির্মম হয়ে না ওঠে, যেখানে মানুষের জীবন ও মানবিকতা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কাছে পরাজিত হয়।