হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published মে ২৬, ২০২৬

সংকীর্ণতার বেড়াজাল ভাঙে লায়লা বাউলদের সুর।

By জহিরুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী, চকরিয়া, কক্সবাজার।

IMG_6294

মঞ্চজুড়ে আলোর রোশনাই, আমন্ত্রিত অতিথিদের কোলাহল আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এমন এক আনুষ্ঠানিক পরিবেশে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ফরিদপুরের লায়লা বাউল। কোনো জমকালো সাজসজ্জা নেই, নেই কৃত্রিম আভিজাত্যের প্রদর্শন; একেবারে সাধারণ আটপৌরে পোশাকে তিনি মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। আর যখন তাঁর স্বভাবসুলভ দরদ ও মরমি আবেগে খালি গলায় ভেসে উঠল নজরুলের সেই চিরন্তন গান—

“নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচল ভরা ফুল...”

তখন মুহূর্তেই যেন চারপাশের সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল।

মঞ্চের জাঁকজমক আর লায়লা বাউলের সহজ-সরল উপস্থিতির এই বৈপরীত্য পুরো আয়োজনের আবহকে অন্য মাত্রা দেয়। কোনো ভারী বাদ্যযন্ত্র বা কৃত্রিম উপস্থাপনা ছাড়াই যখন একজন বাউল শিল্পীর কণ্ঠে নজরুলের প্রেম ও বিরহের গান ধ্বনিত হলো, তখন তা শুধু সংগীতের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকল না; বরং হয়ে উঠল এক গভীর সাংস্কৃতিক অনুভব। যেন আধুনিকতার ব্যস্ততার ভেতর হঠাৎ করেই ফিরে পাওয়া গেল বাংলার শিকড়ের এক পরিচিত সুর।

ফরিদপুরের লায়লা বাউল দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামীণ জনপদের ধুলোমাখা মাটিতে লোকসংগীতের আলো ছড়িয়ে চলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিচিত পরিমাপ দিয়ে হয়তো তাঁর সাধনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না, কিন্তু লোকজ জীবনবোধ ও মরমিয়া চেতনার সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ সহজেই অনুভব করা যায়। দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই শিল্পী সম্প্রতি নতুনভাবে আলোচনায় আসেন জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক স্মারক অনুষ্ঠানে।

২৫ মে বিকেলে ফরিদপুর শহরের ময়েজ মঞ্জিলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ। ওই অনুষ্ঠানে নজরুল-গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতির মধ্যেই তিনি খালি গলায় গান পরিবেশন করেন। তাঁর নিরাভরণ কণ্ঠের আকুতি মুহূর্তেই শ্রোতাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই পরিবেশনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই নতুন করে উপলব্ধি করেন—

লোকজ সংগীতের ভেতরে এখনও এক গভীর মানবিক শক্তি জীবন্ত হয়ে আছে।শিকড়ের টানে বাউল-সুফি দর্শনলায়লা বাউলের এই অনাড়ম্বর উপস্থিতি আসলে বাংলার দীর্ঘ লোকায়ত ঐতিহ্যেরই এক নীরব বহিঃপ্রকাশ। বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ ভূখণ্ডের প্রাণশক্তি বহুদিন ধরেই গড়ে উঠেছে সহজ জীবনবোধ, মানবিক সহাবস্থান ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের ধারায়। লালন শাহ, হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিমসহ অসংখ্য সাধক ও লোকশিল্পী মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে ফেরার কথাই বলেছেন।

বাউল ও সুফি ধারার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে একটি গভীর আত্মিক সংলাপ গড়ে উঠেছে। পারস্পরিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে এই দুই ধারা বাংলার লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এদের মূল সুর মানবপ্রেম, সহমর্মিতা ও আত্মিক মুক্তির অনুসন্ধান। এখানে বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে মানুষের মূল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লায়লা বাউলের মতো শিল্পীরা যখন গান ধরেন, তখন তাঁদের কণ্ঠ, দেহভঙ্গি ও আবেগের প্রকাশে এক ধরনের মরমি আকুতি ফুটে ওঠে। 

এই আকুতি নিছক বিনোদনের নয়; বরং মানুষের অন্তর্গত সত্যকে স্পর্শ করার এক শিল্পিত প্রয়াস। বাউলদের সাধনা যেমন সংগীতকে আত্মিক উপলব্ধির মাধ্যম হিসেবে দেখেছে, তেমনি সুফি ধারাতেও সুর ও জিকির মানুষের অন্তর্জগতকে উন্মুক্ত করার ভাষা হয়ে উঠেছে।নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাউলের কণ্ঠ

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলার বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ। তিনি যেমন ইসলামী গান ও গজল রচনা করেছেন, তেমনি লিখেছেন শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তন। 

বিখ্যাত উচ্চারণ—“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম 

হিন্দু-মুসলমান”—শুধু কাব্যিক পঙ্‌ক্তি নয়; এটি ছিল সামাজিক সম্প্রীতির এক সাংস্কৃতিক দর্শন।

এই কারণেই লায়লা বাউলের কণ্ঠে নজরুলের গান এত স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত মনে হয়। “ফুল যদি নেই তোমার হাতে, জল রবে না নয়ন পাতে”—এই অনুভূতি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়; এটি মানুষের চিরন্তন আবেগেরই প্রকাশ। বাউলরা যেমন ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধান করেন, নজরুলও তেমনি মানুষকেই সকল বিভেদের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।

ফলে একজন বাউল শিল্পীর কণ্ঠে নজরুলের গান কোনো আরোপিত সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ বলে মনে হয় না; বরং মনে হয় এটি বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সহাবস্থানেরই স্বাভাবিক প্রকাশ।

নারী বাউল ও সংগ্রামের বাস্তবতালোকসংস্কৃতির জগতে একজন নারী শিল্পীর পথচলা কখনোই খুব সহজ ছিল না। 

গ্রামীণ সমাজের সামাজিক সংকোচ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও অবহেলার মধ্য দিয়েই বহু নারী বাউল তাঁদের সাধনা ধরে রেখেছেন। সেই দিক থেকে লায়লা বাউলের উপস্থিতি শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি লোকসংস্কৃতিতে নারীর দৃঢ় অবস্থানেরও প্রতীক।

তাঁদের কণ্ঠে লোকজ সুর অনেক সময় প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা ও আত্মিক স্বাধীনতার ভাষা হয়ে ওঠে। কারণ লোকসংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অভিজ্ঞতা, বেদনা, আশা ও জীবনদর্শনেরও বহিঃপ্রকাশ। নারী বাউলদের সক্রিয় উপস্থিতি তাই বাংলার সংস্কৃতিকে আরও বহুমাত্রিক ও মানবিক করে তোলে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের দায়বর্তমান বিশ্বে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব নানা উপায়ে বেড়ে চলেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে দ্রুত সংযুক্ত করলেও অনেক ক্ষেত্রে সংস্কৃতিচর্চাকে তাৎক্ষণিকতা ও ভোগবাদী বিনোদনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে সাধনানির্ভর লোকসংস্কৃতির অনেক উপাদান ধীরে ধীরে আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

তবে প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আজ গ্রামের একজন বাউল শিল্পীর গান মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই প্রয়োজন এই লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে সৃজনশীল ও গবেষণাভিত্তিক উপায়ে তুলে ধরা। শুধু আবেগ দিয়ে নয়, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার মধ্য দিয়েও এই ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাউল-সুফি ঐতিহ্য কেবল সংগীতের একটি ধারা নয়; এটি সামাজিক সহনশীলতা, মানবিক সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই ঐতিহ্য মানুষে মানুষে দূরত্ব কমায় এবং আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখে। যদি এই লোকায়ত সুর একদিন স্তব্ধ হয়ে যায়, তবে বাঙালির আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও নিঃশব্দে হারিয়ে যাবে।

শেষকথা

বাংলার মাটি জয়দেব-চণ্ডীদাসের, এ মাটি লালন-নজরুলের, এ মাটি শাহজালালসহ অসংখ্য সাধক-মানবতাবাদীর উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডে বিভাজনের রাজনীতি সাময়িকভাবে অস্থিরতা তৈরি করতে পারলেও, লোকজ সংস্কৃতির উদার সুর শেষ পর্যন্ত মানুষকেই একত্রিত করার কথা বলে।

ফরিদপুরের লায়লা বাউলেরা সেই চিরন্তন সত্যেরই প্রতীক। তাঁদের গান, সাধনা ও জীবনদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

যতদিন বাংলার মাঠে-ঘাটে কোনো বাউল মানুষের গান গেয়ে উঠবেন, ততদিন এই মাটির মানবিক আত্মাও নিঃশেষ হবে না।এই আত্মাকে রক্ষা করাই হোক আমাদের সময়ের অন্যতম সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার।