রক্তাক্ত ২১ আগস্ট: ট্র্যাজেডি, আমাদের নেত্রী ও অবিচল আন্দোলনের দিনপঞ্জি
By সাবিনা ইয়াছমিন, নির্বাহী সম্পাদক, বেঙ্গল টাইমস।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে আগস্ট মাস গভীর শোক ও বেদনার এক অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় সে সময় বিদেশে অবস্থান করায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান আমাদের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা।
স্বজন হারানোর গভীর বেদনা বুকে ধারণ করে ১৯৮১ সালে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরিবার হারানোর অসীম কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি দেশের মানুষের জন্য একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের লক্ষ্যে নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও তিনি স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুক্ত হন। তাঁর আহ্বানে দেশের মানুষ নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এগিয়ে যায়।
তবে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক উত্থান নানা ষড়যন্ত্রের জন্ম দেয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি গণতন্ত্রকে সুসংহত করার উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তি দেওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া আইনি পথে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে। ওই সময় দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষও নির্যাতনের শিকার হন। রাজপথ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে এবং ‘বাংলা ভাই’-এর মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।
এত নিপীড়ন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখ হাসিনা পিছিয়ে যাননি। বরং দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও জোরদার করেন এবং রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
এই ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যেই ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বিকেলে উন্মুক্ত ট্রাক-মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার পর শেখ হাসিনা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানের মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। তিনি মঞ্চ থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই নেমে আসে এক ভয়াবহ বিভীষিকা।
বিকেল ৫টা ২২ মিনিটের দিকে মঞ্চের দক্ষিণ পাশের দিকে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। এর পরপরই মাত্র দেড় মিনিটের ব্যবধানে একের পর এক মোট ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ধোঁয়া, আতঙ্ক ও আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে। অসংখ্য নেতা-কর্মী রক্তাক্ত অবস্থায় রাজপথে লুটিয়ে পড়েন।
প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে মানবঢাল তৈরি করেন। তাঁকে বুলেটপ্রুফ গাড়িতে তুলে নেওয়ার সময়ও হামলাকারীরা গুলি চালাতে থাকে।
বর্বরোচিত ওই গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান এবং শত শত নেতা-কর্মী আহত হন। নেতা-কর্মীদের মানবঢালের কারণে শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর চোখ ও দুই কানে আঘাত লাগে এবং পরবর্তীতে তাঁর শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হয়।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মতো ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকেও আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থকেরা দেশের গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তিকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি ভয়াবহ ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে থাকেন। কিন্তু রক্তপাত, নির্যাতন ও নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আন্দোলন বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২১ আগস্টের ভয়াবহ হামলায় নিহত সব শহীদ এবং আত্মদানকারী নেতা-কর্মীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে থাকবে।