ইউরোপের বাজারে ধাক্কা, নতুন গন্তব্যে ভরসা খুঁজছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
By অর্থনীতি ডেস্ক, বেঙ্গল টাইমস:
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রফতানি কমে যাওয়ায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা, ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দাভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের প্রভাবে দেশের পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে।
তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রফতানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচলিত বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনই ভবিষ্যতের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত।
ইউরোপেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলতি অর্থবছরে রফতানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ফলে মোট পোশাক রফতানিতে ইইউর অংশও কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ, উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে।
জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে রফতানি কমেছে
ইইউর মধ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে রফতানি ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
একই সময়ে ফ্রান্সে রফতানি কমেছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ইতালিতে ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারকরা উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছেন।উত্তর আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যে আশার আলোইউরোপে মন্দার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যে রফতানি বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার এবং কানাডায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ২০ শতাংশ।
বর্তমানে এই তিনটি বাজার বাংলাদেশের মোট পোশাক রফতানির ৩৫ শতাংশেরও বেশি অংশ ধারণ করছে, যা ইউরোপীয় বাজারের দুর্বলতার কিছুটা প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও চীনে নতুন সম্ভাবনাঅপ্রচলিত বাজারে সামগ্রিক রফতানি কিছুটা কমলেও কয়েকটি দেশে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
সৌদি আরবে রফতানি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং চীনে ১৭ দশমিক ১২ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত সম্প্রসারিত খুচরা বাজার বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।
নিট পোশাক খাত বেশি চাপেপণ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিট পোশাক রফতানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রফতানি তুলনামূলক স্থিতিশীল থেকেছে এবং মাত্র শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।এলডিসি উত্তরণ ও বাণিজ্য চুক্তির চ্যালেঞ্জপোশাক খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন,
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকবে কি না—তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলো ইউরোপ ও অন্যান্য বড় বাজারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়ানোয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ, বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নতুন কৌশল জরুরিখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র স্বল্পমূল্যের মৌলিক পোশাক উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নেও জোর দিতে হবে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
ইউরোপের বাজারে দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন বাজারে আরও আগ্রাসী কৌশল,
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং টেকসই ও উদ্ভাবনী
পোশাক উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক
শিল্পকে নতুন বাস্তবতার
সঙ্গে খাপ
খাইয়ে নিতে হবে।
তাদের মতে,
বর্তমান সংকট
যেমন একটি সতর্কবার্তা,
তেমনি বাজার বহুমুখীকরণ ও
নীতিগত সংস্কারের
মাধ্যমে নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করছে।