হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published আগস্ট ২৮, ২০২৬

গুলশান-বনানীর স্পা সেন্টারে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, নেপথ্যে কারা?

By বেঙ্গল টাইমস প্রতিবেদক

IMG_9386

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীতে স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে চক্রটি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন স্পা সেন্টারে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষকে গ্রেপ্তারের পর এসব প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, আবার কেউ সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর মন্তব্য করতে চাননি।

গুলশান-বনানীতে অর্ধশতাধিক স্পা

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুলশান-১, গুলশান-২ ও বনানী এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক স্পা সেন্টার রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ বৈধ স্পা সেবার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

গুলশান-১-এর বিভিন্ন ভবন, গুলশান-২-এর একাধিক সড়ক এবং বনানীর কয়েকটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে এমন স্পা পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠানের বাইরে কোনো দৃশ্যমান সাইনবোর্ডও নেই। ফলে বাইরে থেকে দেখলে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম চলছে, তা বোঝার সুযোগ থাকে না বলে স্থানীয়দের দাবি।

মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে নানা অভিযোগ

বনানীর একটি ভবনের সাত তলায় পরিচালিত একটি স্পা সেন্টার নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, শাওন নামের এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।

সেখানে স্পা সেবার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে বলেও অভিযোগ করেন তারা। অভিযোগের বিষয়ে শাওনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন।

পরবর্তী সময়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গুলশান-২ গোলচত্বরের কাছাকাছি একটি ভবনে পরিচালিত আরেকটি স্পা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, রত্না নামের এক নারী প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন এবং অভিযোগের বিষয়ে কেউ কথা বললে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। রত্নার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পা পরিচালনার বিষয়টি স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, অন্যরা যেভাবে পরিচালনা করেন, তিনিও সেভাবেই ব্যবসা করেন। নৈতিকতা-অনৈতিকতার বিষয়টি জেনেই তিনি এ ব্যবসায় আছেন বলেও মন্তব্য করেন।এদিকে বনানী কবরস্থানের বিপরীত পাশে পরিচালিত একটি স্পা নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।

তাদের দাবি, শহীদ নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।শহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন। পরবর্তী কলগুলোতেও তিনি সাড়া দেননি।

অনলাইন প্রচারণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এজেন্ট

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু স্পা সেন্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ম্যাসাজ ও থেরাপির প্রচারণা চালাচ্ছে।

এর মধ্যে থাই, সুইডিশ, ডিপ টিস্যু, হট অয়েল, ড্রাই ম্যাসাজ, বডি স্ক্রাব ও হট স্টোন থেরাপির মতো সেবার উল্লেখ রয়েছে। একটি স্পা সেন্টারের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন সেবার জন্য কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে তুলনামূলক বেশি মূল্য নির্ধারণের তথ্য পাওয়া গেছে।

ওয়েবসাইটে দেওয়া একটি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সাগর নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি জানান, তিনি বর্তমানে এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবে সেবা দিয়ে থাকেন এবং গ্রাহক পেলে তিনি তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন বলে জানান।

অনলাইনের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল নম্বরসহ ভিজিটিং কার্ড বিতরণের কথাও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব কার্ডের মাধ্যমে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গুলশান-বনানীর কিছু স্পাকে ঘিরে কয়েকজন দালাল বা এজেন্ট কাজ করেন। তারা গ্রাহক সংগ্রহ, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ঠিকানায় গ্রাহক পাঠানোর কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিসিটিভির নজরদারি

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে প্রবেশপথ, মূল দরজা, সিঁড়ি ও ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। ভেতর থেকে ক্যামেরাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের ওপর নজর রাখা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সম্পর্কে আগাম সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করা হয়।

স্পার আড়ালে কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ?

স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠানে বৈধ ম্যাসাজ বা থেরাপি সেবার পাশাপাশি যৌন বাণিজ্যের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কোথাও কোথাও নারী কর্মীদের দিয়ে গ্রাহক আকর্ষণের পর নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে আলাদা কক্ষে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নয়

এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন দাবিও করা যাচ্ছে না।

পুলিশের বিরুদ্ধে ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ

গুলশান ও বনানীর কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে স্থানীয়ভাবে কথা বলা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তাদের দাবি, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবার একই ধরনের কার্যক্রম শুরু হয়।গুলশানের এক ব্যবসায়ী বলেন, কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান-বনানীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তার দাবি, প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এমন কার্যক্রম চালানো কঠিন।আরেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

বনানীর এক বাসিন্দার ভাষ্য, স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তার মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, লাইসেন্স, অর্থের উৎস ও পরিচালনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

সাম্প্রতিক অভিযানে গ্রেপ্তার শতাধিক

অভিযোগের মধ্যে সম্প্রতি গুলশান ও বনানীর কয়েকটি স্পা সেন্টারে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গুলশান-২-এর প্লাটিনাম মার্কেটের একটি স্পা সেন্টারে ডিবির গুলশান বিভাগ অভিযান চালিয়ে ১৯ নারী ও তিন পুরুষসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে।এ ছাড়া গুলশান থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে কয়েকটি স্পা সেন্টার থেকে আরও ২৯ নারী ও ২৪ পুরুষকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং অসামাজিক কার্যকলাপ নিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, অভিজাত আবাসিক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখতে অবৈধ স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।

তিনি বলেন, নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—শুধু স্পা সেন্টারে অভিযান চালিয়ে নয়, এর পেছনে থাকা অর্থদাতা, পরিচালনাকারী, দালালচক্র

এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে কি না।