ছয় মাসে দেশে ৮৬ শিশু হত্যা, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৩৬: সবচেয়ে অনিরাপদ হয়ে উঠছে নিজ ঘর
By বিশেষ প্রতিনিধি | বেঙ্গল টাইমস, ঢাকা | প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশে শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত নিজ ঘর ও পরিচিত পরিবেশই এখন ক্রমেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) দেশে অন্তত ৮৬ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৩১২টি পৃথক ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩৬ জন শিশু।
শিশু অধিকারবিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর প্রকাশিত সাম্প্রতিক মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধে অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে তাদের বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিচিত ব্যক্তিদের নাম।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু নির্যাতন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশু নির্যাতনের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে ১২৪টি শিশুহত্যা এবং ৩০৮ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। অথচ ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম ছয় মাসেই শিশুহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩৬ জন শিশু।
নিহত ৮৬ শিশুর মধ্যে ৪৭ জন মেয়ে, ৩৬ জন ছেলে এবং তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ০ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু নির্যাতন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৫ সালের পুরো বছরে দেশে ১২৪টি শিশুহত্যা এবং ৩০৮ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।
অথচ ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম ছয় মাসেই শিশুহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩৬ জন শিশু।নিহত ৮৬ শিশুর মধ্যে ৪৭ জন মেয়ে, ৩৬ জন ছেলে এবং ৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশু।
পারিবারিক পরিবেশেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট শিশুহত্যার ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে—নিজ বাড়ি বা আত্মীয়ের বাসায়।
এছাড়া ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে রাস্তা, মাঠ, বাজার কিংবা জলাশয়ের মতো জনপরিসরে।
১৭টি ঘটনায় সরাসরি বাবা-মা অভিযুক্ত হয়েছেন। ১১টি ঘটনায় অভিযুক্ত নিকট আত্মীয় এবং ২২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তি।
শিশুহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ, ব্যক্তিগত বিরোধ ও ক্ষোভকে দায়ী করা হয়েছে, যা মোট ঘটনার ২২ দশমিক ৯ শতাংশ।
যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১২টি ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩৬ জন শিশু।
এর মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ১৭৫ জন শিশু, যা মোট ভুক্তভোগীর ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী আরও ৯০ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মোট ঘটনার মধ্যে ১৯১টি ছিল ধর্ষণ, ৭৫টি ধর্ষণের চেষ্টা, ৪৪টি একাধিকবার ধর্ষণের ঘটনা এবং ২৬টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ।
যৌন নির্যাতনের পরিণতিও ছিল ভয়াবহ। নির্যাতনের পর ২ জন শিশু আত্মহত্যা করেছে, ১১ জন গর্ভধারণে বাধ্য হয়েছে এবং ৩২ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাক, বুদ্ধি বা শারীরিক প্রতিবন্ধী অন্তত ১৬ জন শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগপ্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৬টি শিশুহত্যার ঘটনায় ৪৪টি মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকি অধিকাংশ মামলার তদন্ত এখনো চলমান।সংস্থাটির আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন,“শিশু অধিকার লঙ্ঘন এখন একটি গুরুতর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ”শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।