মতিঝিল আইডিয়ালে এক রাতে ৪৬ শিক্ষক বদলি, তুমুল আলোচনা
By বেঙ্গল টাইমস প্রতিবেদক
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল শাখা থেকে একসঙ্গে ৪৬ শিক্ষককে বনশ্রী ও মুগদা শাখায় বদলির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভাষ্য, রোববার (২৩ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে আকস্মিকভাবে তাদের বদলির আদেশ জানানো হয়। বদলি হওয়া শিক্ষকদের বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে একসঙ্গে এত সংখ্যক শিক্ষককে বদলির সিদ্ধান্তের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক। তাদের আশঙ্কা, সামনে বার্ষিক পরীক্ষা থাকায় হঠাৎ বড় ধরনের শিক্ষক পুনর্বিন্যাসের প্রভাব শিক্ষার্থীদের পাঠদানে পড়তে পারে।
তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়। বিভিন্ন শাখায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট মোকাবিলা, শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য আনা এবং পাঠদানের মান উন্নত করার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, মূল শাখা থেকে ৪৩ জন শিক্ষককে অন্য শাখায় পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যায়ও বলা হয়েছে, ২২ আগস্ট গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো এবং শাখাগুলোর শিক্ষক সংকট দূর করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।যদিও বিভিন্ন সূত্রে বদলি হওয়া শিক্ষকের সংখ্যা ৪৬ বলে জানা গেছে।
রাতের সিদ্ধান্তে শিক্ষকদের অসন্তোষ
বদলি হওয়া কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এত রাতে হঠাৎ বদলির আদেশ পাওয়ায় তারা বিস্মিত হয়েছেন।
একসঙ্গে এত শিক্ষককে মূল শাখা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একজন শিক্ষক বলেন, আইডিয়ালের ইতিহাসে এত বড় পরিসরে একসঙ্গে শিক্ষক বদলির ঘটনা নজিরবিহীন। বার্ষিক পরীক্ষার আগে এ ধরনের পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
বদলি হওয়া কয়েকজন শিক্ষক সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের আপত্তি ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য কীভাবে আগেই বাইরে গেল, তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
অনিয়ম দূর করার দাবি কর্তৃপক্ষের
শিক্ষক বদলির সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নাকচ করেছেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক লাল মোহাম্মদ।
তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই শাখায় দায়িত্ব পালন করা শিক্ষকদের পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিবেশ দূর করার উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি হওয়া অনেক শিক্ষক পাঁচ থেকে সাত বছর ধরে মতিঝিল মূল শাখায় কর্মরত ছিলেন।
দীর্ঘ সময় একই শাখায় দায়িত্ব পালনের ফলে শিক্ষক বণ্টনে ভারসাম্য আনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল।তবে শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, দীর্ঘদিন একই শাখায় দায়িত্ব পালন যদি বদলির অন্যতম মানদণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য একটি লিখিত নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
অভিভাবকদেরও প্রশ্ন
অভিভাবকদের একটি অংশ মনে করছে, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতিমালা থাকা জরুরি। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবীর দুলু প্রস্তাব দিয়েছেন,
কোনো শিক্ষক একটি শাখায় তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর নিয়ম অনুযায়ী তাকে অন্য শাখায় বদলির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তার মতে, এমন নীতি চালু হলে দীর্ঘদিন একই শাখায় থেকে অনৈতিক কোচিং, ভর্তি বা টিউশন বাণিজ্যের সুযোগ কমবে।
তবে নিয়মটি যেন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, শিক্ষকের অভিজ্ঞতা, বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজন ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ, প্রমাণ মেলেনি
বদলি হওয়া কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান বা বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা অভিযোগ ছড়িয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়, নিয়োগ ও বদলি ঘিরে আর্থিক লেনদেন এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তর নিয়ে বিভিন্ন দাবি রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও রাজনৈতিক পক্ষপাত বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক লেনদেন নিয়েও অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। একটি সূত্রের বরাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, গভর্নিং বডির নতুন সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি সরকারি ব্যাংকের কমলাপুর শাখা থেকে প্রতিষ্ঠানের ৪৬ কোটি টাকা অন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাহজাহানপুর শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
শিক্ষার্থীদের পাঠদানই এখন বড় প্রশ্ন
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতিঝিল, বনশ্রী ও মুগদা—এই তিন শাখায় বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৭০০ এবং কর্মচারী রয়েছেন দুই শতাধিক।এত বড় একটি প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক বদলির ফলে একাডেমিক কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে বার্ষিক পরীক্ষা সামনে থাকায় নতুন দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষকরা কত দ্রুত শ্রেণিকক্ষে যোগ দেন এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান কতটা নির্বিঘ্ন রাখা যায়, তার ওপর নজর থাকবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের।
কর্তৃপক্ষের যুক্তি অনুযায়ী, শিক্ষক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে যদি শাখাভিত্তিক সংকট দূর ও পাঠদানের মান উন্নত করা যায়, তাহলে সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সমতা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।