হোম রাজনীতি জাতীয় আন্তর্জাতিক সারাদেশ খেলাধুলা বিনোদন অর্থনীতি স্বাস্থ্য শিক্ষা চাকরি তথ্যপ্রযুক্তি আবহাওয়া মতামত
Bengal Times
Published আগস্ট ৯, ২০২৬

মামলা-গ্রেপ্তার-অবসর ওএসডি: চাপের মুখে পুলিশের বড় রদবদল

By স্টাফ রিপোর্টার, বেঙ্গল টাইমস | ঢাকা ৯ আগস্ট ২০২৬

E7A6DCB4-AA6A-46AA-96B3-B3C2CDA4710D

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে পুলিশের ওপর নেমে এসেছে বহুমুখী প্রশাসনিক ও আইনি চাপ। আন্দোলনের সময় গুলি চালানোসহ বিভিন্ন অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার, আর ৫৭ জন এখনো পলাতক রয়েছেন।

এর পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসর, ১৪২ জনকে ওএসডি ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত এবং পলায়নের অভিযোগে ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন তৈরি হয়েছে।

পুলিশের ওপর নেওয়া এসব পদক্ষেপ নিয়ে অবশ্য ভিন্নমতও রয়েছে। অভিযুক্তদের একটি অংশের দাবি, প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা যাচাই না করেই অনেক কর্মকর্তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

তাঁদের ভাষ্য, কেউ ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ছিল না, আবার কেউ অন্য ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এরপরও তাঁদের আসামি করা হয়েছে।

অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এতে প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি নির্দোষ কর্মকর্তারাও হয়রানি ও শাস্তির মুখে পড়ছেন বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের আরেকটি অংশের মত, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁরা বলছেন, প্রতিটি ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মামলায় আসামি ১,৪৯০ পুলিশ সদস্য

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে এখন পর্যন্ত পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের নাম এসেছে।

 তাঁদের মধ্যে ৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।গ্রেপ্তার হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং থানার ওসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাও রয়েছেন।

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮০ জন পরবর্তী সময়ে কর্মস্থলে ফিরেছেন।

এখনো ৫৭ জনের হদিস নেই। পলাতক কর্মকর্তাদের তালিকায় ডিআইজি থেকে শুরু করে অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, পরিদর্শক, উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবল রয়েছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পলাতক সদস্যদের চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় বরখাস্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর ২৫ বছরের বেশি চাকরির মেয়াদ থাকা সদস্যদের সরাসরি বরখাস্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অবসরে ১৪১ জন

গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৪১ জন সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই ১৭ জন কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ৫৬ জন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর আরও ৮৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৮ জন পুলিশ সদস্য। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাও বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা রয়েছে।

ওএসডি ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত ১৪২ জন

পুলিশ বাহিনীতে প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আরও ১৪২ জনকে ওএসডি ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৮২ জনকে ওএসডি করা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য জানা গেছে। এ ছাড়া পলায়নের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ৯৩ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং ১৭ জন এএসপি।

এর বাইরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পলাতকদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশের উদ্যোগ

কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে রেড নোটিশ জারির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেসব মামলায় পুলিশ সদস্যদের সাজা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে মামলা, গ্রেপ্তার, পলাতক থাকা, সাময়িক বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর ও প্রশাসনিক পদায়নের কারণে বর্তমানে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন চলছে।

তবে এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের ভেতরে চলমান এই পরিবর্তনের প্রভাব মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

একই সঙ্গে নির্দোষ কোনো কর্মকর্তা যাতে হয়রানি বা অন্যায়ের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের শৃঙ্খলা, পেশাদারত্ব ও জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো আগামী দিনে বাহিনীর কাঠামোতে আরও পরিবর্তন আনতে পারে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের সমন্বয়েই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব।